ThuNov232017

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা: বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

  • PDF
Change font size:

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন


স্বাধীনতা কী? কেন মানুষ স্বাধীনতা চায়? স্বাধীন হওয়া আসলেই কী সম্ভব? স্বাধীনতা ও মুক্তি, এ দু’য়ের মধ্যে পার্থক্য কী? এ রকম হাজারো প্রশ্নের জবাব মানুষ ু সচেতন বা অবচেতন মনে জানতে চায়। আবার এই স্বাধীনতার সাথে নিজস্বতা বা স্বকীয়তার মধ্যে যে সম্পর্ক ও গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে তাও গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থবহ স্বাধীনতার জন্য। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনত কী ব্যাক্তিগত স্বাধীনতার, না ব্যাক্তিগত স্বাধীনতা রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার উপর প্রভাব বিস্তার করে বা মূখ্যভুমিকা পালন করে? আবার স্বাধীনতার সাথে ব্যাক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্টীয় দায়বদ্ধতা কতটুকু তাও গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া স্বাধীনতা কোন চেতনার মধ্য দিয়ে লাভ করে এবং তাকে টিকিয়ে রাখার জন্য কোন চেতনার প্রয়োজন আছে কিনা তাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ বিষয় গুলির বিস্তৃত ব্যাখ্যার জন্য যুগ যুগ সময়ের প্রয়োজন। নিদ্দিষ্ট পরিসরে কখনও প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা সম্ভব নয়। কারণ প্রতিটি বিষয়ের গতিপ্রকৃতি সময়ের ও বাস্তবতার সাথে পরিবর্তনশীল। এরপরও স্বাধীনতা ও চেতনার মধ্যে কিছু মৌলিক ও সাধরণ মিল ও পার্থক্য আছে।

চিন্তাশীলতার প্রভাবে মানব জাতি ক্রমেই উন্নতি লাভ করেছে, করছে এবং করবে। কারণ চিন্তা জাতীয় জীবনকে সংগঠিত, দৃঢ়ীভুত ও বলিষ্ঠ করে। চিন্তাশীল ব্যক্তিগন সমাজতরুরও মূলসরূপ। যে সমাজে চিন্তাশীল ব্যাক্তি যত অধিক, সে সমাজ তত অধিক শ্রেষ্ঠ ও শক্তিসম্পন্ন। সমাজে চিন্তাশীল মহাত্মগন জন্ম গ্রহন করে বলেই অধ:পতিত সমাজ উন্নত অথবা দূর্বল সমাজ প্রবল হতে পারে না। কিন্তু এই চিন্তাশীলতা অনুশীলন স্বাধীন পরিবেশেই সম্ভব এবং ব্যাক্তি চিন্তাশীলতার উন্নতির মধ্যদিয়ে সামগ্রিকভাবে জনসমাজের উন্নতি সম্ভব নয়। তাই রাষ্ট্রের স্বাধীনতা প্রয়োজন সবার আগে। অন্যথায় পরাধীনতার করতলে নানা প্রভাব বিস্তার করে এবং দু:চিন্তা বা কুচিন্তা বাসা বাধে মানুষের অন্তরে। ফলে অসংখ্য ক্লান্তিকর পাপরাশি ভুমিকা পালন করে এবং জাতীয় চেতনাকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে।

রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা:
শতাব্দী থেকে শতাব্দী বাংলাদেশের এই ভূখন্ডে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ তাদের স্ব-স্ব ধর্ম-কর্ম, সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠানসহ শান্তিপূর্ণভাবে সহঅবস্থান করে এসেছে। এই সহ অবস্থানমূলক বসবাসের মাধ্যমে এদেশের মানুষ গড়ে তুলেছে সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্য। তবে যুগে যুগে এই ভূখন্ডের জনগণ বিদেশী শাসক শোষকদের হাতে শোষিত-নিপীড়িত এবং লুন্ঠিত হয়েছে। বৃটিশদের সুদীর্ঘ দু’শো বছরেরও বেশি সময় শোষন এখনো আনেকের স্মৃতিতে দু:স্বপ্নের মতই জেগে আছে। একইভাবে হিন্দু ব্রাহ্ম্রনবাদ ও জালেম জমিদারী প্রথার মাধ্যমেও নিষ্পেষিত হয়েছে এই ভূখন্ডের জনগণ। সর্বশেষ, ভারত বিভক্তি এবং তারই ফলশ্রুতিতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্ম হয়।

বৃটিশ রচিত ঊপনিবেশিক আমলান্তান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা বহাল রেখে পাকিস্তানের উঠতি পুঁজিবাদী গোষ্ঠী, বিশেষ করে সামরিক এবং বেসামরিক আমলাগোষ্ঠী এ অঞ্চলের জনগণের উপর বিমাতাসূলভ আচরণ এবং শোষন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে। যার ফলে এ অঞ্চল থেকে যায় অনগ্রসর, অবহেলিত এবং নিগৃহীত। নিগৃহীত জনগণের অভাব-অনটন, হতাশা ও বিক্ষোভ ক্রম:শই পুঞ্জীভূত হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে ধূমায়িত হতে হতে ১৯৭১ সালে একটি প্রবল আগ্নেয়গিরির মতই উ˜্গীরণ ঘটে। এই উ˜্গীরণই পরবর্তিতে স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নেয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম হচ্ছে বাঙ্গালী জাতির ধারাবাহীক মুক্তি আন্দোলনেরই একটি স্বত:স্ফুর্ত এবং সক্রিয় রূপ। যুগ যুগ ধরে বাঙ্গালী জাতি দেশি –বিদেশি শাসক-শোষকের বিরুদ্ধে নিরবিচ্ছিন্নভাবে লড়াই করে এসেছেÑকখনও করেছে সংঘবদ্ধভাবে। নিরবিচ্ছিন্ন লড়াইয়ের মধ্যে লালিত মুক্তি পাগল বাঙ্গালী জাতি সর্বযুগেই শোষকদের কবর রচনা করেছে এবং আন্দোলনের ধারার অব্যাহত রেখেছে।

১৯৭১ সালের গনঅভূত্থান ছিল একটি যুগান্তকারী গৌরবময় অধ্যায়। এ অধ্যায় রচনা করতে অসীম ত্যাগ-তিতিক্ষার শিকার হতে হয়েছে। প্রাণদিয়েছে লক্ষ লক্ষ দামাল সন্তান, তাজা রক্ত ঝরেছে অঢেল, ইজ্জত নষ্ঠ হয়েছে অগনিত মা-বোনের। স্বপ্ন ছিল স্বাধীন-মুক্ত হওয়া। দেশ শত্রু মুক্ত হলে এদেশে কায়েম হবে একটি শোষনহীন সমাজ ব্যাবস্থা। খাদ্যে-বস্ত্রে দেশ হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষি, শিল্প, ব্যাবসা-বানিজ্য সুষ্ঠভাবে বিকশিত হবে। গড়ে উঠবে স্বাধীন জাতির পুজিঁ। মানুষের মান সম্মান এবং জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। দেশে থাকবে আইনের শাসন। মর্যদার দিক হতে সকল জনগণ হবে সমান। বাঙ্গালি জাতি বিশ্বে লাভ করবে একটি সুখী, স্বাধীন , সমৃদ্ধ সার্বভৌম জাতি হিসাবে। কিন্তু স্বাধীনতা পেয়েও যেন পেলাম না।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ঃ
শোষণ জুলুমের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রাম পরিচালনা করার অগ্নি শপথপুষ্ট চেতনার নামই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আর এই চেতনার তৈরির প্রাণকেন্দ্র হিসাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এক অনবদ্য জীবনী শক্তি। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের বিয়াল্লিশ বছর পর মুল্যায়ণ করার প্রয়োজন এসেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়নের পথে কতটুকু সফল আমরা হয়েছি । যদি না হয়, কেন হয়নি তাও মূল্যায়ন করা এবং সে ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা কোথায় বিশ্লেষণ করে যুগপোযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নিদিষ্টরূপ যে ছিলনা তা নয়, তবে সে চেতনা সীমাবদ্ধ ছিল একটি বিশেষ মহলের মধ্যে এবং তারাা হচ্ছে তৎকালীন ছাত্র সমাজের একটি ক্ষুদ্রঅংশ বিশেষ-বিশেষ করে বাংলাদশ ছাত্র লীগের সেই অংশটি যার নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্র নেতা সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ প্রমুথ। কিন্তু এ সকল ক্ষেত্রে দেশপ্রেম, নিষ্ঠা এবং সততার তীব্র তারতম্য ছিল।


স্বাধীনচেতা সরকার:
বৃহৎ শক্তির বন্ধুত্বের থাবা এড়ানো আজ অতি দুঃসাধ্য, ’বরণ করে নিলে হজম করার ও দূরুহ ও দুঃসহ’। তাই এমন পরিবেশ দরকার শুধু স্বাধীনতার নয়, সাথে সাথে স্বাধীন চেতনারও দরকার। এই স্বাধীনচেতনাই পারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমূন্নুত রাখতে। আর এই চেতনাই তৈরী করবে স্বাধীনচেতা সবকার। স্বাধীনচেতা সরকারের বৈশিষ্ট্য হবে তিনটি।

প্রথমত ঃ সরকারের প্রতিটি সদস্য হবে চরিত্রবান। কোন প্রকার দূর্নীতি তাদেরকে পেয়ে বসবে না। তাদের সাধনাই শুধু চরিত্রকে সমুন্নত রেখে জনগণের সেবা করে যাওয়া। লোভ লালসা অংহকার এসব থেকে তারা থাকবে মুক্ত। জনগণের সন্তুষ্টিই শুধু তাদের কাম্য নিজেদের বলে কিছুই নেই। তারা হবেন দু:সাহসী, নির্ভীক কর্মী-সৈনিক ।

দ্বিতীয়ত: স্বাধীনচেতা সরকারে দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হল নির্ভেজাল জাতীয়তা। নির্ভেজাল বলতে হয় এই জন্য অধিকাংশ জাতীয়তাবাদী সরকার জনগণকে ধোঁকা দিয়ে থাকে। নির্ভেজাল জাতীয়তাবোধে উদ্দীপ্ত স^াধীনচেতা সরকারের একটি মাত্রই লক্ষ্য হয়ে থাকবে জাতিকে আতœনির্ভশীল ও স্বয়ংসম্পুর্ণ করে গড়ে তোলা। জীবন ধারনের প্রয়োজনে কোন কিছুর জন্য যাতে অন্যদেশে হাত পাততে না হয় সেই পথ লক্ষ্য করে খামার কারখানার উৎপাদনের প্রতি সর্বোচ্চ নজর দেয়া।

তৃতীয়ত: স্বাধীনচেতা সরকার দেশ ও জাতিকে গতিশীল মত ও পথের সন্ধান দিয়ে থাকেন। যেমত ও পথ দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য, পরিবেশ ও মননশীলতাকে গতিশীল রাখতে সক্ষম একটি বাস্তব পরিবেশ এবং স্বাধীনচেতা সরকার জাতিকে সেই পথের সন্ধান দিয়ে থাকবেন । এমনিক যদি তাদেরকে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থেকে সরে পড়তেও হয়। সেই সরকার জাতির গতিকে অস্বীকার করে সংকীর্ণতা ও কুপম-পকতায় মজে যেতে পারে না, জনগণ স্বতঃস্ফুর্ততার সাথে যা চায় সেই সরকার তাই মেনে নিবে। তবে আবেগে জনগণ সম্প্রাদ[য়িক কিছু উত্থাপন করলে যুক্তির মধ্য দিয়ে তার প্রকৃত রূপ জনগণকে বুঝিয়ে দিতে হবে এবং সরকারের অবস্থান পরিস্কার করতে হবে। কারণ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যদিয়ে আমরা আতœনির্ভর ও আতœনিয়ন্ত্রের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছি। তাই স্বাধীনচেতা হতে হবে সরকারকে অন্যথায় জাতির মনের গতিকে রুদ্ধ রাখা যাবে না । রাখলে রক্তের সীমানা থাকবে না। জনগণ সময় মতো সঠিক জবাব দিয়ে থাকবে।

সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত বাংলাদেশ :
১৮৫৭ সালে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের পর থেকে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও হিন্দু জাতীয়তাবাদের চালে এদেশে হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়ের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তখন থেকেই হিন্দুরা হয়ে যায় জমিদার, মুলসমানরা প্রজা, হিন্দুরা মহাজন। মুসলমানরা ঘাতক, হিন্দু ব্যব্যসায়ী, মুসলমান খরিদার, হিন্দু অফিসার, মুসলমান পিয়ন। এক কথায় নানা কৌশলে বাংলাদেশে উচ্চ শ্রেণী বলতে হিন্দু আর নিম্ন শ্রেণী মুসলমান হয়ে যায়। এই দুইয়ের অর্থনৈতিক সামাজিক বৈষম্য বৃটিশের উস্কানিতে ধর্মীয় উম্মত্ততায় ঢালাই হাওয়াতে দাঙ্গা ও শোষণ চলতে থাকে। হিন্দু-মুসলমান উভয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করে আন্দোলনের মাধ্যমে। তাছাড়া পরবর্তীকালে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে আদর্শের বদলে ধর্মীয় প্রাধান্যে রাজনৈতিক চেতনায় ফুটে উঠায় সর্বত্র সাম্প্রদায়তিকতার শিকড় মজবুত হয়ে বসে। এসবের পরিণতি জঘণ্য রুপ ধারণ করে গ্রামে-গঞ্জে শহরে-বন্দরে কতবার যে দাঙ্গা হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।


কিন্তু ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির মধ্যে পরিস্থিতি নতুন রুপ লাভ করে। মুসলমানরা ধীরে ধীরে আধিপত্ত বিস্তারে সচেষ্ট হয়। কিন্তু মুুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানী সৈন্যরা ও তাদের দুসরদের নির্যাতনের ফলে হিন্দুরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে যদিও দাবী করা হয়, বাংলাদেশের রক্তাক্ত বিপ্লব ঘটে গেছে আসলে রক্তপাতই শুধু হয়েছে মানসিকতার পরিবর্তন ঘটেনি। তাই স্বানীনতার পরপর যা ঘটেছে তা আতœপ্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে। হিন্দু শরনার্থীরা গ্রামে শহরে ফিরে এসেছে, নিজেদের দোকান বাড়ীতে বটে, কিন্তু বীতশ্রদ্ধ মন নিয়ে। নয়টি মাসে মানুষের পক্ষে যা সহ্য করার নয় তাই তারা করেছে।

মুজিব চেতনা স্বাধীনতার প্রতীক ঃ
বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী চেতনায় গোটা জাতি হয়ে উঠল বলিষ্ঠ থেকে বলিষ্ঠতর এবং প্রচ-ভাবে উদ্দীপ্ত। শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা ছাপ দেশের আনাচে কানাচে আকাশে বাতাসে বিদ্যমান হয়ে উঠল। সর্বস্তরের জনগণের মুখে মুখে উচ্চারিত হতে লাগল একটি প্রিয় নাম “মুজিব”, বাউলের এক তারায় শুনেছি তাঁর নাম, মাঝি গাওয়া ভাটিয়ালীতে শুনেছে তাঁর নাম, কিষাণের ভাওয়াইয়ায় ফুটে উঠেছে তাঁর নাম। সে কি আলোড়ন সারা দেশব্যাপি, সে কি হিন্দোল। এ যেন ছিল মাহসাগরেরই উত্থানের মত দিকে দিকে ভরপুর সে। ’এক নেতা, এক দেশ’, বঙ্গবন্ধুর নাম বাস্তবতার সাথে অঙ্গীভূত হয়ে পড়ল। ‘মুজিব’ জাতীয় চেতনার কেন্দ্রবিন্দু এবং ‘একমাত্র প্রতীক’ এ পরিণত হলেন। এ প্রতীকটিই বাঙ্গালীর সশস্ত্র গনবিষ্ফোরণের প্রথম উপদান হিসাবে পরিণত হয়ে গেল। মুজিবের কন্ঠই তখন যে কোন সশস্ত্র শক্তির তুলনায় অধিকতর শক্তিশালী হয়ে পড়ল। তার নির্দেশে জাতি তখন যে কোন শক্তির মোকাবেলা করার মত মানসিকতা অর্জন করল। এখানেই মুজিবের নেতৃত্বের পরিচালিত গণ আন্দোলনের চরম স্বার্থকতা। একটি কন্ঠই যখন সমগ্র জাতিকে সশস্ত্ররুপে সজ্জিত হওয়ার সাহস জোগায়, সে জাতিকে পরাভূত করার শক্তিতে তখন আর কারোর প্রভাবও থাকে না। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকা রেসকোর্সে দেশ ও জাতির উদ্দেশ্য শেখ মুজিবের সেই যাদুকরী কণ্ঠে যে ভাষণ প্রচারিত হল, তার মধ্য দিয়ে মুলত পাকিস্তানের সমাধি রচনা এবং আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের সুচনালগ্ন ঘোষিত হয়ে যায়। ’এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, ... . . তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড় ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল’। , ঐতিহাসিক ঘটনাটি কাজ করেছিল হল সত্তরের নির্বাচন। সত্তরের নির্বাচনে নিরস্কুশ বিজয় লাভের মধ্যে দিয়ে প্রকৃত পক্ষে পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অঞ্চলের জনগনই যে স্পষ্ট রায়টি দিয়েছিল, আর এক রাষ্ট্র নয় আমরা দু’টি ভিন্ন রাষ্ট্র, আমাদের আশা আকাঙ্খা, স্বপ্ন-স্বাদ এবং চাহিদা ভিন্নতর। উভয় দেশের জনগণের রায়ই যেন দুই দেশের জন্য দু’টি ভিন্ন রাষ্ট্র রচনার সিদ্ধান্ত দিয়ে দিল।

বিদেশী প্রভূ ও তাদের বর্তমান ভূমিকাঃ
স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে কোন কোন রাষ্ট্র কিভাবে সত্যের পক্ষে কথা বলেছে এবং মুক্তিকামী মানুষকে সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভে ভূমিকা রেয়েছে তা কম বেশি সবার জানা। কিন্তু স্বাধীনতার পর কে কিভাবে এবং কেন আমাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করছে এর সঠিক মূল্যায়ন করতে না পারাও আমাদের চেতনার ধংসের একটি কারণ। তাই এর উত্তোরণের জন্য বিদেশি ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান রাখা এবং সতর্কতা অবলন্বন করার অর্থ এ নয় যে, জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত আবেগ ও অনুভূতির প্রতি আশ্রদ্ধা প্রকাশ করা কিন্বা তা অস্বীকার করা। এই হিসেবে যারাই গরমিল করেছে তারাই প্রকৃত পক্ষে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তাছাড়া বিদেশি প্রভুদের মাতাব্বরির উদ্দেশ্য উপনিবেশের কাঠামো বা কৌশল, কারণ এ যুগে তো আর দেশ দখল করে রেখে অঙ্গরাজ্যে পরিনত করা হয় না, তথাকথিত নীতির জালেই পেঁচিয়ে রাখা হয় কোন দেশকে । শক্তিশালী দেশসমূহ দূর্বল দেশ ও জাতিকে বিভিন্ন চুক্তি এবং শর্তে আবদ্ধ রাখে।

মুক্তি বাহিনীর মুক্তি ও অপমান ঃ
কোন সন্দেহ নাই মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ও সাহাসী বীর। তাদের জীবনের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি, কিন্তু দেশ মুক্ত হলেও মুক্তিবাহিনী আজো মুক্তি পায়নি। তারা সন্দেহ-অপবাদ, অবহেলা, হয়রানি ও ভিক্ষাবৃত্তির বেড়াজালে আবদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা ও তাদের মুক্তযোদ্ধকালীন ইতিহাস আজো অধরা কিন্তু যখন যে ক্ষমতায় যায় সেই তার মত করে তালিকা করে, এতে স্বাধীনতার মূল চেতনাকে দূর্বল করে দেয়া হচ্ছে। তাদের প্রতি কটাক্ষ স্বাধীনতার পর হতে এখনো বিদ্যমান। এ অপমান স্বাধীনতার।
মনে প্রাণে বিশ্বাস করা প্রয়োজন স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালে বাংলাদেশবাসী তথা বিশ্বজনতা অস্থায়ী সরকারের এবং স্বতঃস্ফুর্তভাবে গড়ে উঠা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের উপর আস্থাবান হয়ে আজাদীর স্বপ্ন দেখেছিল।

জাতির বীর মুক্তিযোদ্ধারা আজ উপহাস, কৌতুক ও করুণার পাত্র। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতেই মুক্তিযোদ্ধারা হয়েছে এবং হচ্ছে নাজেহাল । মুক্তিযুদ্ধের পরে মুক্তিযোদ্ধারাই হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের চরম শত্রু। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যদি একই হয়ে থাকে তাহলে এ দুঃখ ও লজ্জাজনক বিভক্তি, শত্রুতা এবং নিধান প্রক্রিয়া কেন? তাহলে এ মুক্তিযুদ্ধের পেছনে আসল রহস্যটা কি?

সমাজের পুনর্বাসন প্রয়োজন কাদের? সমাজের পঙ্গু, আনাথ, আঁতুর , বোবা, ভিক্ষুক, পতিতা ইত্যাদি অবেহেলিত এবং অক্ষম শ্রেনীর জন্যই প্রয়োজন পূনর্বাসনের। মুক্তিযোদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেয়া জাতির মুক্তিযোদ্ধারা কারো দ্বারা পূনর্বাসিত হয়না, বরং মুক্তিযোদ্ধারাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী হয়। তাদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে তারাই সমাজের পুরাতন কাঠামো ভেঙ্গে দিয়ে নতুন রাষ্ট্রীয় কাঠামো বির্নিমানের মধ্য দিয়ে সমাজের শ্রেষ্ঠত নিগৃহীত শ্রেণী সমুহকে পুর্নবাসন করে।

জাতির বীর যোদ্ধরাই যদি হয়ে পড়ে করুণার পাত্র এবং করে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন, সে জাতির সাধারণ জনগনের ভোগান্তি আর দুর্দশার যে কোন সীমাই থাকেনা তা আজ আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা প্রত্যক্ষ করলেই স্পষ্ট অনুধাবণ করা যায়, অথচ ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধই বাঙালি সত্তাকে বিশ্ববাসীর দরবারে নতুন আঙ্গিকে সুপরিচিত করে দিয়েছে। বীরত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ ও জাতি এ গৌরবের আসন অধীকার করেছে। এ গৌরবের অংশীদার সমগ্র জাতি। এ গৌরব কোন বিশেষ ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা কোন দল বিশেষের নয়। এমন একটি গৌরবকে যখন কোন বিশেষ ব্যক্তি গোষ্ঠী কিন্বা কোন রাজনৈতীক দল কিন্বা মুক্তিযোদ্ধে সহকারী কোন দেশ বা ব্যক্তি গোষ্ঠী কিন্বা জাতি নিজেদের একক কৃতিত্বের দাবিদার হয় তখনই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ কেবল বির্তকিতই হয়ে ওঠে না জনগণের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জন্ম নেয় নানারূপ প্রশ্নের এবং সন্দেহের । বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের পর প্রতিটি ক্ষমতাসীন সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি এই সুপরিকল্পিত অবহেলার দ্বারা জাতির সংগ্রামী চেতনাকে স্তদ্ধ করে দেওয়ার প্রয়াস চালিয়েছে এবং চালাচ্ছে।

কিন্তু সঠিক দিক নির্দেশনা বা উন্নত পরিবেশ ও^ স্বার্থান্বেষী মহলের সম্পৃক্ততার করণে শিক্ষার আজ বেহাল অবস্থা। ছাত্র ছাত্রীরা নানা অপকর্মে নিজেদের জড়িয়ে পেলেছে। শিক্ষাকরা একই কাজ করছেন । সবচেয়ে ভয়ানক হচ্ছে শিক্ষক শিক্ষকারা যখন নিজ ছাত্র ছাত্রীদের যৌনাত্যাচার করে এবং রাজনৈতীক প্রভাবে মুক্ত থাকে তখন একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যত কত অন্ধকার তা বুঝা যায়। আর শিক্ষা ব্যবস্থা দূর্বল অর্থই হল জাতীয় চেতনাকে মৃত্যুর পথে একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

এ ক্ষেত্রে শিক্ষার অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি, যোগ্যতা সম্পন্য শিক্ষক সমাজ তৈরি করা, শিক্ষকদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা মানসম্মত পর্যায়ে বৃদ্ধি করা । শিক্ষকদের নৈতিকতা বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে আমরা শিক্ষাব্যবস্থাকে সঠিক জায়গায় নিয়ে যেতে পারব। তাই সকলের আন্তরিক প্রয়াসে সম্ভব শিক্ষাব্যবস্থা উন্নতি সাধনের মাধ্যমে সুন্দর ও নেতৃত্বদানকারী দেশ হিসেবে আমাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে ।

পরিশেষে একথা উল্লেখযোগ্য সাধারণ জনগণকেই মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের চেতনা এবং পরবর্তী সময়ের চেতনা সমুন্নত রাখতে হবে। কারণ যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ে রাজনৈতীক নেতৃত্বদানকারী ও বুদ্ধিজীবিরা ঐক্যবদ্ধ চেতনার রূপ তৈরী করেন, কিন্তু সেই চেতনায় সাড়া দিয়ে সাধারণ জনগণ সর্বাধীক জীবন বাজি রেখেছিল এবং স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে এনেছে। আই বলে নেত্রীবৃন্দ ভুল করে যাবেন অথবা কোন স্বার্থান্বেষী মহল বিশেষ উদ্দেশ্যে চেতনাকে ধ্বংস করবে এবং আমরা চুপচাপ বসে থাকতে পারিনা কারণ এই চুপচাপ থাকার মানেই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করা। ছাত্র শিক্ষক, যুবক-বৃদ্ধ, শ্রমিক-জনতা, পেশাজীবী-অপেশাজীবি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার মধ্যদিয়ে সুন্দর একটি সোনার বাংলা তৈরী করা সম্ভব। যার মধ্যদিয়েই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব।


মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
সেক্রেটারি, চারুতা ফাউন্ডেশন
রূপনগর, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬

লধংযরসহঁন@ুধযড়ড়.পড়স
E mail :  This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it

Comments (0)Add Comment

Write comment
smaller | bigger

busy

Highlights Archive

More Highlights

Science and Technology

Entertainment

Travel

Life Style & Fashion

Health