FriJul282017

ভারত নয়: বেগম জিয়াকে দেশবাসীর ওপর নির্ভর হতে হবে

  • PDF
Change font size:

 


মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন

দল হিসেবে বিএনপি এবং নেত্রী হিসেবে বিএনপি’র চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার ঠিকানা দিল্লী নয়, বরং ঢাকা, বাংলাদেশ। এ কথা শুধু আমার নয়, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের বিশ্বাস। এবং খোদ খালেদা জিয়া তথা বিএনপি’র বিঘোষিত ঘোষণা - বিদেশে আমাদের কোন প্রভু নেই, বন্ধু আছে। আমার মতো যারা বাংলাদেশের পৃথক সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব এবং কার্যকর স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করেন তারা কোন দেশকে তাদের প্রভু হিসেবে মেনে নেবেন না, সে দূরের হোক কিংবা কাছের হোক - একাত্তর সনে আমাদের বন্ধু থাকুক কিংবা শত্র“ থাকুক। কোন দেশের সাথে আমরা বুঝাপড়া ও উঠা-বসা করবো তার আজকের ভূমিকাকে বিচার-বিশ্লেষণ করে। অতীতে আমাদের প্রতি তাদের ইতিবাচক ভূমিকার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ থাকবো, কিন্তু আমাদের দেশের সার্বিক স্বার্থ রক্ষা করে। বন্ধুত্বের বদান্যতা দেখিয়ে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের আবরণে দেশের কৌশলগত চাবিগুলো কোন স্বার্থান্বেষী স্বার্থশিকারী আগ্রাসী শক্তির কাছে তুলে দেয়া কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কিংবা বন্ধুত্বের নজির হতে পারে না। বন্ধুত্বের আবরণে কেউ আমাদেরকে তাদের ছায়ারাষ্ট্রে পরিণত করবে, আমাদের ওপর ছড়ি ঘুরাবে, তারা যেভাবে ঘুরাতে চাইবে আমরা সেভাবে ঘুরবো, এমনটি হতে পারে না - এসব হলো পরাধীনতার সহোদর, স্বাধীনতার পরিপন্থী। স্বাধীনতা মানে শুধু একটা পতাকা কিংবা সরকার, এমনকি ভূখণ্ডের অধিকারী থাকাও নয়, স্বাধীনতা মানে বহির্শক্তির প্রভাবমুক্ত থেকে নিজেদের মতো করে নিজেদের স্বদেশ গড়ে তোলার ক্ষমতা অর্জন ও কর্তৃত্ব প্রয়োগ করা।

২০১৪ সনে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশকে নিয়ে বহুবিধ চক্রান্ত সক্রিয় রয়েছে। এ চক্রান্তের প্রধান কেন্দ্র হলো নয়া দিল্লী। তারা বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নির্মূল করার নানাবিধ প্রকল্প নিয়ে মাঠে নেমেছে। এ ধরনের একটি প্রকল্প হলো জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রতীক বিএনপি’কে জনগণের কাছে অপ্রিয় করার জন্য দুর্ণীতিবাজ হিসেবে চিত্রিত ও চিহ্নিত করা।

গত চার বছরে দুর্ণীতি বাংলাদেশে কেমন প্রকট আকার ধারণ করেছে, তা সারা বিশ্বের মানুষ এখন আরো ভালোভাবে জানেন। অথচ বিএনপি’র বিরুদ্ধে দুর্ণীতির অনেক সত্য-মিথ্যা গল্প প্রতিদিনই বলা হচ্ছে। কিন্তু এতদসত্বেও বাংলাদেশের মানুষ বিএনপি’কেই তাদের আশা-আকাঙ্খার প্রতীক বলে মনে করে। বিএনপি’র মূল পুঁজি হলো মানুষের এ বিশ্বাস - বিএনপি যতোই খারাপ হোক, এ দলটি দেশের স্বার্থকে কারো কাছে বিলিয়ে দেবে না। এ বিশ্বাসই হলো জনগণের কাছে যাবার জন্য বিএনপি’র একমাত্র সম্পদ আর সড়ক । বিএনপি’র এ সম্পদ হারিয়ে যাবে, এ সড়ক ভেঙ্গে যাবে যদি বিএনপি ভারত কিংবা অন্য কোন দেশের কাছে বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত স্বার্থ তুলে দেয়, বিএনপি যদি আওয়ামী লীগের মতো আচরণ করে, আওয়ামী লীগ দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলী দিয়ে ভারতকে যেসব আপত্তিকর সুবিধা-স্বার্থ দিয়েছে, বিএনপি যদি সেগুলোকে মেনে নেয়। অবশ্য আশার কথা হলো, বেগম জিয়া ইতোমধ্যেই এমন ঘোষণা দিয়েছেন যে, বিএনপি ভারতের সাথে শেখ হাসিনা সরকারের স্বাক্ষরিত আপত্তিকর চুক্তি মেনে নেবে না। এটাই হলো বিএনপি’র সাথে আওয়ামী লীগের মূল পার্থক্য। এ পার্থক্যের পতাকা বিএনপি’কে উর্দ্ধে তুলে ধরতে হবে। এ পতাকা হারানো যাবে না।

যদি বিএনপি কোন কারণে বাংলাদেশের স্বার্থের বাইরে গিয়ে ভারতের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে বাংলাদেশে বিএনপি’র রাজনীতি শেষ হয়ে যাবে। বিএনপি’র শূন্য জায়গায় একই ধারার আরেকটি দল বেরিয়ে আসতে অনেক সময় পেরিয়ে যাবে। আর এরই মধ্যে দেশের অস্তিত্ব স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব চরম হুমকির মুখে পড়বে। বিএনপি’র অস্তিত্বের সাথে দেশের সুস্থি সমৃদ্ধি তথা অস্তিত্ব অনেকাংশে একীভূত হয়ে গেছে।

আমি বিএনপি কিংবা অন্যকোন দলের সদস্য নই। বিএনপি’র কেউই আমাকে চেনেন না। কোন দলের প্রতি আমার কোন আনুগত্যতা নেই। গত ৪২ বছরে কোন সরকার বা দল থেকে আমি কোন সুবিধা আদায় করি নি। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতা গ্রহণেরও কোন চেষ্টা করি নি। নোয়াখালীর সহযোদ্ধাদের চাপে শুধু শেখ হাসিনার স্বাক্ষরিত একটি সার্টিফিকেট ছাড়া আমি কোন সরকারের কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করি নি। আমার মেয়ে বা ছেলেকে মেডিক্যাল কলেজ বা অন্যত্র ভর্তি করানোর জন্যও ঐ সার্টিফিকেট ব্যবহার করি নি, তারা তাদের যোগ্যতা দিয়ে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বরাদ্ধকৃত কোন প্লট পাওয়ার চেষ্টাও করি নি। কেবলমাত্র দুর্ণীতিকে অপছন্দ করতাম বলেই রাজনীতির অত্যন্ত ভাল অবস্থান থেকে সরে এসে সাধারণ মানুষের কাতারবন্দী হয়েছি। আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতে গিয়ে অনেক কিছু হারালেও একটি দেশ অর্জন করেছি। সে দেশটা অর্জনে শেখ মুজিবের হিসেব মতে ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছেন। শেখ মুজিব-জিয়াকেও সে দেশের জন্য জীবন দিতে হয়েছে। আমি সে দেশটাকে বাস্তব অর্থে স্বাধীন রাখতে চাই, একে রক্ষা করতে চাই, তা জীবনের বিনিময়ে হলেও।

সময়ের বিবর্তনে আমি বর্তমান মুহুর্তে শত অভিযোগ থাকা সত্বেও বিএনপি’কে সে দেশ রক্ষার সহযোগী মনে করি। আমার মতো লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধা তা-ই মনে করেন। আমরা ভারতবিরোধী নই । গত ৪১ বছরে ভারতের আচরণ প্রমাণ করেছে, ভারত আমাদের সুখ-সমৃদ্ধি কামনা করে না, আমাদেরকে শান্তিতে রাখতে চায় না। ভারত আমাদেরকে গোলাম বানাতে চায়, গ্রাস করতে চায়। ভারত আমাদের সাথে সৎপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ করলে আমাদেরকে ভারতবিরোধী বলার সুযোগ সৃষ্টি হতো না। আর বিএনপি’রও অভ্যুদয় ঘটতো না। বেগম জিয়াকে একথাগুলো মনে করিয়ে দিতে চাই - আপনারা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের আবেগ আর অনুভূতিকে বুঝার এবং মূল্যায়ন করার চেষ্টা করুন। আপনাদেরকে মনে রাখতে হবে, দেশ আপনাদের কাছে অনেক কিছু প্রত্যাশা করে। আমার মতো লাখ লাখ বাংলাদেশী আপনাদেরকে শুধু দেশরক্ষার জন্যই সমর্থন করেন। আপনারা জনগণের সাথে থাকুন। জনগণ আপনাদেরকে দিল্লীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে বার বার ক্ষমতায় বসিয়েছে। সে জনগণই আপনাদের শক্তি। সুতরাং আপনাদের ভূমিকাই নির্ধারণ করবে সাধারণ মানুষের সমর্থন-সহযোগিতা আপনাদের অনুকূলে থাকবে কি না।

বিএনপি তথা বেগম জিয়াকে অবশ্যই আরো মনে রাখতে হবে, তার দল কখনোই ভারতের কাছে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের মতো বিশ্বস্ততা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারবে না। দিল্লী কখনোই বিএনপি’কে ভারতের বন্ধু হিসেবে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করবে না। সুতরাং নয়া দিল্লীতে কথিত লাল-গালিছা সম্বর্ধনা কিংবা উচ্চমার্গের অভ্যর্থনা অথবা রাজকীয় আপ্যায়ন বা অতি-ভদ্রোচিত আচরণে মুগ্ধ কিংবা বিমোহিত হবার কোন সুযোগ নেই। এ ধরনের সম্বর্ধনা এইতো সেদিন স্বৈরাচার এরশাদকেও নতুন দিল্লীতে দেয়া হয়েছিল। একই ধরনের আদর-আপ্যায়ন পেয়েছিল সিকিম কংগ্রেসের তৎকালীন নেতা লেন্দুপ দর্জিও, যাকে ব্যবহার করে ভারত সিকিম দখল করে নেয়। সিকিম দখলের পর ভারতের কাছে দর্জির প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে বলে ভারত তাকে থুথুর মতো ছুঁড়ে ফেলে।

সুতরাং ভারতের লোক-দেখানো আচরণে মুগ্ধ হবার কোন সুযোগ নেই। এটা হলো ভারতের চালবাজি, এক ধরনের ফাঁদ। ভারত তার প্রয়োজনে এর চেয়েও অনেক নমনীয় হতে পারে, আরো শুয়ে যেতে পারে। এগুলো হলো তার কৌশল। কিন্তু এর অর্থ এটা নয়, যে, ভারত বাংলাদেশের প্রশ্নে সামান্য নমনীয় হয়েছে, তার বাংলাদেশবিরোধী আগ্রাসী নীতি পরিত্যাগ করেছে, সীমান্তে মানুষ হত্যা বন্ধ করেছে, নদীর ওপর নির্মিত বাঁধ ভেঙ্গে দিয়েছে, কাঁটাতারের বেড়া তুলে নিয়েছে। ভারত এগুলো তখনই করতে বাধ্য হবে যখন আমরা শক্তি অর্জন করবো, যখন আমরা নয়া দিল্লীকে নয়, আমাদের দেশের জনগণকে ক্ষমতার উৎস মনে করবো। তখনই দিল্লী আমাদেরকে মূল্য দেবে, যখন আমাদের দেশের নীতি-নির্ধারকরা প্রমাণ করতে পারবেন তারা দিল্লীর দাবার গুটি কিংবা চর নন - বাংলাদেশের প্রতিনিধি, স্বাধীন হিসেবে সম-মর্যাদার অধিকারী। মর্যাদার দিক থেকে দিল্লীর চেয়ে মোটেই নিচে নন। এটা তখনই সম্ভব যখন আমাদের নেতা-নেত্রীরা ক্ষমতায় যাবার জন্য কিংবা ক্ষমতায় আসার জন্য, অথকা ক্ষমতায় থাকার জন্য দিল্লীর কাছে বিক্রি হবেন না, ধর্না দিবেন না, কিংবা ক্ষমতা হারানোর পর ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিবেন না।

যারা আমাদের সরকার পরিচালনা করেন তাদের শান-শওকত, আরাম-আয়েশ, বিলাসিতার বোঝা বহন করে বাংলাদেশের জনগণ। কিন্তু তারা চলবেন ভারতের নির্দেশে, ভারতের স্বার্থে - তা’হলে বাংলাদেশের মানুষ তাদেরকে কেন ভোট দেবে? নিজের খেয়ে পরের গান গাওয়া মানেই তো দেশের সাথে জনগণের সাথে প্রতারণা করা । এ ধরনের ব্যক্তি কিংবা ব্যক্তিবর্গকে চিনতে হবে, এদের বক্তৃতা, বিবৃতি, ভিশনের আশ্বাসে বিশ্বাস কিংবা বিমোহিত হলে চলবে না। এদের আসল ভূমিকা কার পক্ষে যায়, তা অনুধাবন করতে হবে। এদের শিকড় কোথায়, কোন স্থানের সূতার টানে তারা চলাফেরা করে - তা নির্ণয় করেই এদেরকে গ্রহণ কিংবা বর্জন করতে হবে।

বেগম জিয়ার ভারত সফরকে যেভাবেই মূল্যায়ন করা হোক না কেন, এ সফর থেকে তার দল এবং বাংলাদেশ কিছুই পাবে না। বরং এতে বেগম জিয়া এবং বিএনপি’র অবস্থান ইমেজ প্রশ্নবিদ্ধ করার এবং ক্ষতিগ্রস্থ হবার যথেষ্ট সম্ভবনা রয়েছে। এবং সে প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। ভারতের ইঙ্গিতেই বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ভারতীয় আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তিরা প্রচার মাধ্যমে বেগম জিয়ার এ সফরকে নেতিবাচক এমনকি ভারতের কাছে আত্মসমর্পন চিত্রিত করে প্রচারণার কাজে নেমে পড়েছে। উদ্দেশ্য হলো বেগম জিয়া ও তার দলের গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তাকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা। কারণ ভারতের প্রধান শত্র“ হলো বাংলাদেশের ঐ সব সাধারণ মানুষ যারা বাংলাদেশকে কার্যকরভাবে স্বাধীন-সার্বভৌম রাখতে চায় এবং তাদের কাছে হাজারো বিরূপ নেতিবাচক প্রচারণা সত্বেও বিএনপি হচ্ছে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার নির্ভরযোগ্য শক্তি। তাই জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে বিএনপি এখনো অনেক এগিয়ে।

এটা ভারত ভাল করেই জানে এবং জানে বলেই খালেদা জিয়াকে বিতর্কিত করে তাকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার কৌশল হিসেবে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বেগম জিয়াকে এ দুরভিসন্ধি অনুধাবন করতে হবে। বেগম জিয়াকে মনে রাখতে হবে শহীদ জিয়া কার চক্রান্তে নিহত হয়েছেন? কারা বাংলাদেশে এক এগারোর তাণ্ডব এনে দেশের ওপর সুনামি বইয়ে দিয়েছে? ঐ তাণ্ডবের মূল বেনিফিশিয়ারী কোন দেশ? তারেক রহমানের ওপর যে অত্যাচার হয়েছে, তা কি কেবল দুর্ণীতির কারণেই? মোটেই তা নয়। তারেক রহমানের অপরাধ - তিনি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাড়া-মহল্লায় ঘুরে ঘুরে বাংলাদেশের তরুণ সমাজের প্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। তারই খেসারত হলো তার ওপর অমানবিক হামলা, চরম নির্যাতন। তাকে জীবনে শেষ না করে রাজনৈতিকভাবে শেষ করার চক্রান্ত এখনো সক্রিয় । এজন্যই নানা অভিযোগে মামলা। দেশে আসলেই গ্রেফতার করার ঘোষণা। উদ্দেশ্য একটাই তার রাজনীতি শেষ করতে হবে। তাকে দাম্ভিক দুর্ণীতিবাজ হিসেবে প্রমাণ করতে হবে, যাতে জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশীরা তাকে পরিত্যাগ করে, তাকে ঘৃণা করে। এসবই বেগম জিয়ার জানা আছে। তাই অতীতকে ভুলে গেলে চলবে না।

অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যত রচনা করতে হবে। অতীতকে ভুলে গেলে বিএনপি’র রাজনীতি তো মাঠে মারা যাবেই, উপরন্ত বাংলাদেশও প্রথম পর্যায়ে ভূটান এবং পরবর্তী পর্যায়ে সিকিমের মতো ভারতে পেটে চলে যাবে। সে সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য নিয়েই ভারত জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে চক্রান্তের জাল বিছায়। সে চক্রান্তের প্রথম শিকার শহীদ জিয়া। এক এগারো সে চক্রান্তের আরেকটি অধ্যায়ের বাস্তবায়ন, যার নির্মম শিকার তাকের রহমান। তার মূল অপরাধ তিনি জনতার কাছে জনপ্রিয়। এখানেই ভারতের শঙ্কা। সে শঙ্কা দূর করতে হলে বিএনপি’কে বিতর্কিত করতে হবে। বিএনপি’কে শেষ করতে হবে। তা’হলে তারেক রহমান জীবন্মৃত হবেন।

বেগম জিয়ার দিল্লী সফরকে ভারতে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাসীন করার এবং বিএনপি’কে পরবর্তী নির্বাচনে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অকেজো করার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইবে। নিউ ইয়র্কে বিভিন্নভাবে একটা বার্তা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে যে, বেগম জিয়া তারেক রহমানকে রক্ষার জন্য ভারতের সাথে আপোষ করেছেন। এ প্রচারণাও উদ্দেশ্য প্রনোদিত ও জঘন্য চক্রান্তের অংশবিশেষ।

ভারতের এ চক্রান্ত ব্যর্থ করার চাবি এখন বেগম জিয়ার হাতে। এবং তা’ করার একমাত্র পন্থা হলো বিএনপি’র বিঘোষিত নীতি অনুসরণ করা। আপোষহীন অবস্থানে থাকা। ভারতের সাথে আমাদের কোন বৈরিতা নেই। আমরা যা লিখছি কিংবা বলছি তা ভারত-বিরোধিতা নয়, এটা আমাদের সক্রিয়তা-অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। ভারতের আচরণই আমাদেরকে এ সংগ্রামে লিপ্ত হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ভারতের বাংলাদেশ-বিরোধী আচরণের বিরোধিতা করা কোনভাবেই অন্যায় নয়, বরং একজন দেশপ্রেমিকের পবিত্র দায়িত্ব। বেগম জিয়া (এবং বিএনপি) এতোদিন যাবত এ দায়িত্বটাই পালন করে আসছেন। তিনি (এবং তার দল) সে দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকবেন এটাই প্রত্যাশিত এবং কাম্য।
অপশক্তির সাথে আপোষ কোনদিন ব্যক্তি কিংবা দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না। অন্যায়-অপশক্তির সাথে আপোষ করার কারণে অনেক জনপ্রিয় নেতাই দেশদ্রোহী বিশ্বাসঘাতক হিসেবে নিন্দ্রিত ও ধিকৃত হয়েছেন, আর তাদের দেশ এবং জাতিও হয়েছে বিপদগ্রস্থ। এমন নজির উপমহাদেশেও রয়েছে। কাশ্মীরের বাঘ নামে অভিহিত শেখ আবদুল্লা নেহেরুর মিথ্যে আশ্বাস ও প্রতিশ্র“তিতে বিশ্বাস করে তার সংগ্রামী অবস্থান থেকে সরে গিয়েছিলেন।

ভারতের অধীনেই কাশ্মীর’কে অনেকটা স্বাধীন রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য দিয়ে নেহেরুরা তার সামনে টোপ হিসেবে ফেলেছিল। কাশ্মীরকে স্বশাসিত স্বাধীন রাষ্ট্রের আদলে কাশ্মীরের জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, জাতীয় সংসদ, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীর ব্যবস্থা-সম্বলিত ধারা ভারতীয় সংবিধানে অন্তর্ভূক্ত করা হয় । কাশ্মীর ছিল অনেকটা স্বাধীন । সময়ের ব্যবধানে নেহেরুর সরকারই সংবিধান হতে কাশ্মীরকে স্ব-শাসনের অধিকারসম্বলিত ধারাগুলো বাতিল করে। কাশ্মীর তার বিশেষ মর্যাদা হারায়। কাশ্মীরকে ভারতের সাধারণ রাজ্যের পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়। তখন শেখ আবদুল্লাহর কিছুই বলার বার করার ছিল না । বন্ধু নেহেরু কাশ্মীরের বাঘকে খাঁচায় ঢুকালেন। ভারত যা বলে, যে চুক্তি করে বাস্তবে তা মানে না, এমন কি জাতিসংঘ প্রস্তাব মেনে নেয়ার অঙ্গীকার করেও পরে তা বাস্তবায়নে অস্বীকার করে, যদি তা ভারতরে আগ্রাসী নীতির পরিপন্থী হয়। এমন অসংখ্য নজির ভারত সৃষ্টি করেছে। তার জ্বলন্ত প্রমাণ কাশ্মীর।

এ কাশ্মীরে আজ রক্ত ঝরছে, এ রক্ত স্বাধীনতার জন্য। ভারত হতে বেরিয়ে আসার জন্য। কাশ্মীরীদের বিশ্বাস এমনটি হতো না, যদি শেখ আবদুল্লা নেহেরুকে বিশ্বাস না করতেন, নেহেরুর কাছে মাথা নত না করে আপোষহীন থাকতেন। আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার অধিকারী কাশ্মীরীদের অতি প্রিয় নেতা শেরে-এ-কাশ্মীর শেখ আবদুল্লাহর কবর এখন ভারতীয় সৈন্যরা অহোরাত্রি পাহারা দিয়ে রাখে। কাশ্মীরীরা তাদের দেশে শেখ আবদুল্লার কবরটিও রাখতে চায় না। এটা হচ্ছে আপোষকামিতার পরিণতি।

আপোষ করলেও ভারত বিএনপি’কে কখনোই আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে মেনে নেবে না। বাংলাদেশের বর্তমান জনমত ভারতের জানা আছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিশ্চিত হয়েছে, হাজারো ধরনের প্রচারণা ও অভিযোগ এবং ব্যর্থতা সত্বেও পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপি’কে ঠেকানো যাবে না। অন্যদিকে ভারতীয় নীতি নির্ধারকরা প্রকাশ্যে বলেছেন, শেখ হাসিনা সরকারের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী যেসব সুবিধা আদায় করা গেছে সেগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন এবং বাংলাদেশকে সিকিম বানানের জন্য আরো অন্যান্য সুবিধা আদায় করতে হলে, শেখ হাসিনাকে পরবর্তী মেয়াদে ক্ষমতায় আনতেই হবে।

ভারতীয় নীতি নির্ধারক, আমলা, বুদ্ধিজীবী, সামরিক বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ লেখকরা, এমনকি বীণাসিক্রির মতো কূটনীতিকরা পর্যন্ত কোরাস করছেন: শেখ হাসিনা পরবর্তী মেয়াদে ক্ষমতায় না আসলে বাংলাদেশ আবার ভারতের খপ্পর থেকে বেরিয়ে যাবে। সুতরাং যেকোন মূল্যে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনতেই হবে। বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন দেশে কে ক্ষমতায় আসবে তা ভারতের পক্ষ থেকে বলে দেয়ার মানে হলো ঐ বিশেষ ব্যক্তি বাংলাদেশের চেয়ে ভারতের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তাই তার প্রতি ভারতের এমন প্রবল আগ্রহ। ভারত আওয়ামী লীগকেই তার পছন্দের দল মনে করে। বিশেষজ্ঞদের মতে এ কারণেই সোনিয়া গান্ধী বেগম জিয়ার সাথে দেখা করার সময় না পাওয়ার অজুহাত দেখিয়েছেন। এ কৌশল নিয়ে সোনিয়া আওয়ামী লীগের কাছে এ বার্তা পৌঁছিয়ে দিয়েছেন: কংগ্রেস তথা ভারত সরকার আওয়ামী লীগের সাথেই রয়েছে এবং থাকবে।

এতদসত্বেও আওয়ামী শিবিরে শোকের মাতম শুরু হয়েছে। তাদের আচরণে বক্তৃতা-বিবৃতি প্রমাণ করে, তারা উদ্বিগ্ন। অন্য কেউ দিল্লীর সাধারণ সম্পর্ক গড়ে তুলুক তারা তা চান না। এর মানে এ হলো যে, তারাই দিল্লীর একচ্ছত্র প্রতিনিধি হিসেবে থাকতে চান। বেগম জিয়া চীন কিংবা আমেরিকা সফরে গেলে তাদের কোন কান্নাকাটি শোনা যায় নি, কারণ ঐসব দেশ বাংলাদেশে ভারতের মতো কোন দল বা ব্যক্তিকে পোষে না। কিন্তু বেগম জিয়া ভারতে যাবার সাথে সাথেই কান্নাকাটি শুরু হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বেগম জিয়ার ভারত সফর গুরুত্বহীন। বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ খন্দকার সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন বেগম জিয়া ভারতের কট্টর হিন্দু মৌলবাদী সংগঠন শিবসেনার শীর্ষনেতাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর বেগম খালেদা জিয়ার ভারত প্রসঙ্গে বলেন, ভারতের আশীর্বাদ অর্জন করে ক্ষমতায় যাওয়ার লোভেই বিরোধী দলীয় নেতা ভারত সফরে গিয়েছেন।

এ হলো আওয়ামী মহলে মহাতঙ্কের অংশবিশেষ। বেগম জিয়ার সফরের বিরুদ্ধে এতো বিষোদাগার কেন? বেগম জিয়া নাকি ভারতের সব কথায় রাজী হয়েছেন। কারো কারো অভিযোগ খালেদা জিয়া ‘ইউ-টার্ন’ করেছেন। সৈয়দ আশরাফ ঘোষণা দিয়েছেন, বেগম জিয়া ভারতের কি কি শর্ত মেনে নিয়েছেন, তার দল তা প্রকাশ করবে। সব কথা তো ইতোমধ্যেই প্রকাশ হয়েছে। আরো গোপন কিছু আছে কি? যদি কোন গোপন কিছু থাকেই, তবে সৈয়দ আশরাফ ঢাকায় বসে কিভাবে জানলেন বেগম জিয়ার সাথে ভারতের আর কোন বিষয়ে কি কি কথা হয়েছে? এতে বুঝা গেল, ভারতের বিশ্বস্ত লোক বেগম জিয়া নন, আশরাফরা, কারণ দিল্লী আশরাফদের কাছে সবকিছু বলে দিয়েছে, যা আশরাফদের জানার কথা নয়। আওয়ামী লীগের এমন প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে ‘দৈনিক প্রথম আলো’র মন্তব্য হলো: ভারতে খালেদা জিয়াকে এত গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি আওয়ামী লীগ ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়কে ক্ষুদ্ধ করেছে। বুঝাই যাচ্ছে এ ধরনের প্রচারণার মূল লক্ষ্য হলো বিএনপি’কে বিতর্কিত করে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করা।

বেগম জিয়া জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হবেন না, যদি তিনি আমাদের স্বার্থ বজায় রেখে ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেন। কারণ বাংলাদেশের মানুষ ভারতের সাথে কোন বৈরিতা চায় না। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থ, পৃথক অস্তিত্ব ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব দুর্বল হতে পারে তেমন কোন প্রস্তাবও আমরা কোনভাবেই মেনে নেবে না। আমরা ভারতের সাথে সম-মর্যাদাসম্পন্ন সম্পর্ক চাই। ভারতকে আমরা সৎ ও নির্দোষ প্রতিবেশী হিসেবে দেখতে চাই, কোনভাবেই আমাদের অস্তিত্ববিনাশী প্রভু হিসেবে নয়। ,
বেগম খালেদা জিয়াসহ যে বা যারা বাংলাদেশের সার্বিক স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় থাকবেন, কোন অপপ্রচার তাদেরকে জনগণের মন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। তাদের পথে যতো কাঁটা আসুক না কেন, সময়ের ব্যবধানে সেগুলো দূরীভূত হবে । বেগম জিয়া আপোষহীন নেত্রী, এমন ধারণা প্রমাণ করার সুযোগ আবার এসেছে । তিনি বিচক্ষণতার সাথে প্রমাণ করবেন তিনি দেশের জন্য মানুষের জন্য রাজনীতি করছেন। তার শক্তি বাংলাদেশের জনগণ, ৫৫ হাজার বর্গমাইলের বাইরের কেউ নন। তার ঠিকানা ঢাকা, বাংলাদেশ - দিল্লী, ভারত নয়। *

মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন
লেখক: আমেরিকা প্রবাসী সাংবাদিক ও গবেষক
ঊসধরষ: হড়ধ@ধমহর.পড়স

E Mail :  This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it

Comments (0)Add Comment

Write comment
smaller | bigger

busy

Highlights Archive

More Highlights

Science and Technology

Entertainment

Travel

Life Style & Fashion

Health