TueSep262017

টাঙ্গাইলই হোক আওয়ামী লীগের শেষ নির্বাচনী পরাজয়

  • PDF
Change font size:

 


আবদুল মান্নান


বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী পরাজয়ের তালিকায় আর একটি পরাজয়ের তিলক যোগ হলো । টাঙ্গাইল-৩ আসনের উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী শহিদুল আলম লেবু শোচনীয় ভাবে পরাজিত হলেন আওয়ামী লীগ হতে বহিষ্কৃত বিদ্রোহী প্রার্থী আমানুর রহমান খানের কাছে । ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ধ্বস নামানো বিজয়ের পর বিভিন্ন নির্বাচনে পরাজয় যে তাদের পিছু নিয়েছে তা এখন দলের নেতা কর্মী শুভাকাক্সিক্ষদের জন্য মারাত্মক বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করেছে ।

প্রত্যেকটি নির্বাচনে পরাজয়ের পর দলের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা এই বলে শান্তনা পাওয়ার চেষ্টা করেন এটা গণতন্ত্রের বিজয় এবং এতে প্রমাণ করে দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব । এই ধারা চলতে থাকলেতো আগামী নির্বাচনের পরও এমন কথা বলার জন্য এই নেতা নেত্রীদের প্রস্তুত থাকতে হবে । অথচ বর্তমান সরকার গত চার বছর অনেক প্রতিকূল অবস্থা ও বেশ কিছু ব্যর্থতার মাঝেও দেশে উন্নয়নমূলক কাজতো কম করেনি । বিশ্বমন্দার সময়ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের উপর ধরে রাখতে পেরেছে । দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে, দেশ জঙ্গিমুক্ত হওয়ার কারনে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে । পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় দ্বিগুন হয়েছে । একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচার চলছে । এই সব অর্জনের পরও একাধিক সংসদ উপনির্বাচন (ওবায়দুল মোক্তাদির ও সিমিন হোসেন রিমি ছাড়া), মেয়র, উপজেলা, পৌরসভা চেয়ারম্যান প্রভৃতি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হেরেছে । যেসব নির্বাচনী এলাকা আওয়ামী লীগের দূর্গ বলে পরিচিত সেই সব আসনেও হেরেছে । এই সবের মধ্যে চট্টগ্রাম, নারায়নগঞ্জ, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন, হবিগঞ্জ এবং সর্ব শেষ টাঙ্গাইল সংসদ উপনির্বাচন উল্লেখযোগ্য ।

এখন বড় প্রশ্ন কেন এই সব হার যার মধ্যে কারো কারো মতে অনেকগুলি অপ্রত্যাশিত । বাস্তবতা হচ্ছে এই পরাজয়গুলির কোনটাই অপ্রত্যাশিত ছিলনা । এমন সব পরাজয় আগামী নির্বাচনের জন্যতো একটি অশনি সংকেত । তবে এই সব পরাজয় আবার বিএনপি বা সমমনা দলগুলি যে ভাবে দেখে তাও ঠিক নয় । তাদের উল্লসিত হওয়ার কোন কারণ এ মুহুর্তে নেই । তাদের মতে এই পরাজয় প্রমাণ করে আওয়ামী লীগ জনগণের কাছে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে । যে দল সরকারে থাকে তার জনপ্রিয়তা সাধারণত কমে । এটি একটি সার্বজনীন সত্য পরিস্থিতি । তবে আওয়ামী লীগের উল্লেখিত নির্বাচনগুলিতে হারার পিছনে মূল কারণ গুলির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নেতাদের সাথে কর্মী ও সাধারণ মানুষের দূরত্ব সৃষ্টি, নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের মূল্যায়ন না করা, অন্তঃদলীয় কোন্দল, ভুল প্রার্থী মনোনয়ন, নির্বাচন পরিচালনায় আনাড়িপনা, প্রার্থীর ভাবমূর্তি সংকট ইত্যাদি ।

বর্তমান সরকারের সময় সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরাজয়টা ছিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন । সেই নির্বাচনে একজন সামান্য ওয়ার্ড কমিশনারের কাছে হেরে গেলেন একধা অসম্ভব জনপ্রিয় আওয়ামী লীগ নেতা, তিনবার নির্বাচিত মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী । তার পরাজয়ের পিছনে উপরে উল্লেখিত সব কারণই বিদ্যমান ছিল । চট্টগ্রাম মহানগরে আওয়ামী লীগের বর্তমান যে অবস্থা তা চলতে থাকলে সামনের নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফলাফল পওয়া খুবই কঠিন হবে । এমন অবস্থা অনেক নির্বাচনী এলাকায় বিরাজ করছে ।

ক’দিন আগে একটি জাতীয় দৈনিকে এই মর্মে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে মৌসুমী প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকদের দ্বারস্থ হচ্ছেন । এই সব মৌসুমী পাখিদের মধ্যে আছে ব্যবসায়ী, সাবেক সামরিক বেসামরিক আমলা, শিল্পপতি, অন্য দল হতে হিযরত করে আসা ধান্ধাবাজ রাজনৈতিক নেতা, কালো বাজারী ইত্যাদি । এমন ঘটনা নিশ্চয় বিএনপি ও জাতীয় পার্টিতেও ঘটছে । ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে অমুক দলের এতশত নেতা কর্মীর তমুক দলে যোগদান । তবে এই ঘটনাটি বেশী ঘটবে বিএনপিতে কারণ বিএনপিতো বটেই সুশীল সমাজের একটি অংশ ধরে নিয়েছে ঠিকঠাক মতো চললে আগামীবার বিএনপি তাদের মিত্র জামায়াতকে নিয়ে ফের ক্ষমতায় আসছে । বেগম জিয়ার নেতৃত্বে এর আগে দুবার বিএনপি ক্ষমতায় ছিল । দেশের মানুষ তাদের অপশাসন দেখেছে ।

বর্তমান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারও যে দেশবাসীকে একশত ভাগ সুশাসন উপহার দিচ্ছে তা কেউ বলবেনা তবে নির্মোহ ভাবে চিন্তা করলে দেশ শাসনে ব্যর্থতার দিক দিয়ে বিএনপিকে এখনো আওয়ামী লীগ ছাড়িয়ে যেতে পারেনি । অবশ্য আমার মতের সাথে সকলে সহমত পোষন করবেন তা মনে করিনা । তবে এটিও বলে রাখা ভাল বিগত সংসদ নির্বাচনে মানুষ যখন অওয়ামী লীগকে হাত খুলে ভোট দিয়েছিল তখন তাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশী । পদ্মাসেতু, শেয়ার মার্কেট ও হল মার্কের মতো কেলেঙ্কারীর ঘটনাগুলি বর্তমান সরকারকে নাজুক অবস্থায় ফেলেছে, অনেক বড় বড় অর্জনকে ম্লান করে দিয়েছে । জোট সরকারের আমলে দূর্নীতির মাত্রা ছিল বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলের চেয়ে অনেকগুন বেশী । তাদের সময়ের কোন কোন দূর্নীতির বিষয় আন্তর্জাতিক আদালতেও প্রমাণিত । কিন্তু সেই সব ঘটনা সাধারণ মানুষ ভুলতে বসেছে তার প্রথম কারণ মানুষ গতকাল যা ঘটে তা সহজে মনে রাখে তার আগের দিন কী ঘটেছিল তা বিম্মৃত হয়ে পড়ে । এই বিষয়ে অনেক আগে অষ্ট্রিয়ান মনোবিজ্ঞানী আর্থার জোষ্ট একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন । দ্বিতীয়ত ঐতিহাসিক ভাবে আওয়ামী লীগ তার অর্জনগুলি সঠিক ভাবে প্রচার করতে পারেনা । এদিক দিয়ে বিএনপি’র জুড়ি নেই । সোমবার বেগম জিয়া বরিশালে এক জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে অবলীলায় বলে আসলেন এই সরকারের আমলে পদ্মার উপর সেতু হবেনা কারণ তারা এই সেতুর জন্য বরাদ্দকৃত সব টাকা খেয়ে ফেলেছে । এই সম্পূর্ন অসত্য কথাটি যিনি বললেন তিনি এদেশের দু’বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন । তিনি আরো বললেন তার দল যদি কখনো ক্ষমতায় যায় তা হলে তিনি দেশের চেহারা পল্টে দেবেন । জিয়া-সাত্তারের কথা বাদ দিলেও বেগম জিয়া নিজেতো দশবছর ক্ষমতায় ছিলেন । তখন চেহারা কেন পাল্টায়নি? বললেন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে দেশের সব সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা বিঘিœত হয় । তিনি তার এই বক্তব্য রাখছেন বরিশালে, যে অঞ্চলে গত ২০০১ এর নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়য়ের উপর যে অত্যাচার হয়েছিল তা একাত্তরের সময়কারের অত্যাচারকে হার মানিয়েছিল । এই সব বাস্তবতা আওয়ামী লীগ কার্যকরভাবে খুব বেশী কাজে লাগাতে পারে না ।
নারায়নগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এটি প্রত্যাশিত ছিলযে এখানে একজন ক্লিন ইমেজের প্রার্থীকে আওয়ামী লীগ সমর্থন দেবে । সে আশা দুরাশায় পরিণত হলো যখন দেখা গেল দল হতে এমন একজন প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হলো স্থানীয় ভাবে যার ভাবমূর্তি শূন্যের কোটায় । একটা সময় ছিল যখন দেশের মানুষ শুধু দলের মার্কা দেখে ভোট দিত । তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে সেটি হওয়া এখন সম্ভব নয় । এখন সাধারণ মানুষও খবর রাখে কোন সংসদ সদস্য কী অপকর্মে লিপ্ত থাকে । এই যে টাঙ্গাইলে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে হেরে গেলেন সে হারের কথাতো স্থানীয় মানুষ আগে হতেই নিশ্চিত করেছিল । সেই আসনটি মূলত বিএনপির আসন ।

বিগত নির্বাচনে নৌকার জোয়ারে সেখানে বিজয়ী হলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সম্পূর্ণ একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি ডাঃ মতিউর রহমান । তবে দেখা গেল তার প্রক্সি হিসেবে কাজ করছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম লেবু । লেবু রাজনীতির সব কানাগলি চেনেন । তিনি ঠিকই ডাঃ মতিউর রহমানের প্রক্সি হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে মোটামুটি তার পক্ষে যত রকমের অপকর্ম করা সম্ভব তা তিনি করেছেন বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম হতে জানা যায় । মানুষতো ভোট দিয়েছিলেন ডাঃ মতিউর রহমানকে, শহিদুল ইসলাম লেবুকে নয় । সব চেয়ে বড় কথা ২০০৯ সালে লেবু উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগেরই বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে হেরেছেন । যে ব্যক্তি উপজেলা চেয়ারম্যান পদে হারেন তাকে কোন যুক্তিতে সংসদ সদস্য প্রার্থী করা হয় তা বোধগম্য নয় । তার উপরে যেহেতু এই নির্বাচন বিএনপি বর্জন করছে সেহেতু এটিতো স্বাভাবিক বিএনপি’র সমর্থকরা নৌকার বিরুদ্ধে হাত খুলে ভোট দেবেন ।

বিএনপি’র এখন প্রধান কাজই হচ্ছে যে কোন সুযোগেই আওয়ামী লীগকে ঘায়েল করা। এই সহজ কথাটি কেন আওয়ামী লীগের বুঝতে এত কষ্ট হয় ? বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরো একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা হচ্ছে অনেক প্রার্থী আছেন যারা নির্বাচনের সময় এলাকায় গিয়ে নানা ধরণের বাস্তব অবাস্তব অঙ্গীকার করেন কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার পর তারা এলাকার দায় দায়িত্ব প্রক্সিদের উপর ছেড়ে দিয়ে রাজধানী মুখী হয়ে পড়েন । এর একটি অন্যতম কারণ তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হতে যে কোটি টাকা খরচ করেছেন তা কড়ায় গন্ডায় আদায় করতে হলে রাজধানীতে আসা ছাড়া তার কোন বিকল্প নেই । এই যে যারা মৌসুমী পাখি এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে নোঙ্গর ফেলবেন তাদের কাছে জানতে চাইলে কেন তারা রাজনীতিতে আসছেন একবাক্যে তাদের উত্তর হবে জনগণের সেবা করতে । আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস্তবতা হচ্ছে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার পর তাদের অবস্থা হবে জনগণ গোল্লায় যাক আগে নিজের আখেড়টা গুছিয়ে নিই । আজকাল মানুষ এই সব ঠিকই মূল্যায়ন করে এবং সেই ভাবে সিদ্ধান্ত নেয় । যেহেতু দুই দলের ব্যর্থতার পাল্লা কোন অবস্থাতেই এক নয় সেহেতু আগামী সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ের প্রত্যাশা করতেই পারে । তবে সেই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ দিতে হলে চট্টগ্রাম-নারায়নগঞ্জ-কুমিল্লা-হবিগঞ্জ-টাঙ্গাইল-মার্কা মনোনয়ন হতে দলকে বের হয়ে আসতে হবে । স্থানীয় ত্যাগী কর্মীদের কথা শুনতে হবে । স্থানীয়ভাবে দ্রুততম সময়ে দলের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে । ফেরেস্তা পাওয়া যাবে না তবে চেষ্টা করতে হবে ক্লীন ইমেজের প্রার্থী দিতে । আর যাই হোক দেশের মানুষ কোন অবস্থাতেই জামায়াত শিবির সমর্থিত বিকল্প কোন সরকারকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্টিত দেখতে চায়না । এখনতো সারা দেশে জামায়াত শিবিরের দুর্র্বৃত্তরা পুলিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে । তারা যদি ঘটনা চক্রে ক্ষমতার অংশীদার হয় তা হলে সাধারণ মানুষই ঘর থেকে বের হতে পারবে না । আশা করবো সময় থাকতেই দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচার করে আওয়ামী লীগ আগামী দিনের রাজনৈতিক কৌশল প্রস্তুত করবে । টাঙ্গাইলই হোক আওয়ামী লীগের নির্বাচনী পরাজয়ের শেষ ক্ষেত্র ।


লখক: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আবদুল মান্নান

E Mail :  This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it

Comments (0)Add Comment

Write comment
smaller | bigger

busy

Highlights Archive

More Highlights

Science and Technology

Entertainment

Travel

Life Style & Fashion

Health