MonJul242017

সংলাপের অবমাননাকর পূর্বশর্ত: মারাত্মক বিপর্যয়ের পূর্বাভাষ

  • PDF
Change font size:



মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন, USA

দেশে বিবদমান পরিস্থিতির ইতি ঘটিয়ে সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সবদলের কাছে গ্রহণযোগ্য পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ শুরু করার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে অভিন্ন তাকিদ দেয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন সরকার তথা দল আওয়ামী লীগ’এরই দায়িত্ব বেশি, তাদেরই উদ্যোগ নেয়ার কথা। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ শর্ত জুড়ে দিয়েছেন: সংলাপে বসতে হলে বিএনপি’কে জামায়াত-ই-ইসলাী’ সাথে জোট ছাড়তে হবে। এমন শর্ত বিএনপি’র জন্য কেবল অমাননাকরই নয়, বরং দল হিসেবে বিএনপি’র স্বাধীন সত্বারও পরিপন্থী, যেন বিএনপি আওয়ামী লীগের আজ্ঞাবহ, তারাই নির্দেশ দেবেন বিএনপি কোন দলের সাথে জোট করবে কি করবে না। এ ধরনের অপমানজনক পূর্বশর্ত দিয়ে তো আর যা-ই হোক সংলাপ-সমঝোতা হয় না। আর কোন যুক্তিতে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে জামায়াত ছাড়তে বলে তার ব্যাখ্যা তারা দেন নি। অথচ এ জামায়াত তো আওয়ামী লীগেরই দোসর। এ আওয়ামী লীগই তো জামায়াতকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।

আওয়ামী লীগই ১৯৭২ সনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অনুষ্ঠানের মূলে কুঠারাঘাত করে। ১৬ ডিসেম্বরের আগে-পরে সারা দেশের পলাতক জামায়াত ও মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ, রাজাকার, আলবদর, আল শামস্’ বাহিনীর ধনী সদস্যরা অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের ঘরে আশ্রয় নেয়। জেলা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায়ের আওয়ামী নেতৃবৃন্দ এবং অধিকাংশ আওয়ামী মন্ত্রী, এমপি, এমএলএ, কোন কোন মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক শুধুমাত্র অর্থের বিনিময়ে জামায়াত-মুসলিম লীগ নেতা থেকে শুরু করে শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আল শামস্’ বাহিনীর সদস্যদের নাম ঠিকানা উল্লেখ করে স্বহস্তে লিখে এ মর্মে সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন যে, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তারা কোন অপকর্মে লিপ্ত ছিল না। সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খালি সার্টিফিকেট জেলায় জেলায় পাঠালে জামায়াত নেতা, শান্তিবাহিনী থেকে শুরু করে রাজাকার, আলবদর, আল শামস্’এর সদস্যরা তা সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে কিনে নেয়। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা হলো: ৭ ডিসেম্বর (নোয়াখালী মুক্তি দিবস) থেকে পরবর্তী দিনগুলোতে কেবলমাত্র দরিদ্র রাজাকারদেরকেই জীবন দিতে হয়েছে। শত অপরাধে অপরাধীরা শুধু অর্থের বিনিময়ে কেবলমাত্র জীবনেই বেঁচে যায় নি, তাদের অধিকাংশকে-ই একদিনের জন্যও কারাগারে যেতে হয় নি। এমনকি, আমার গ্রামের বাড়ি যারা দু’দুবার আক্রমণ করেছে তাদের সহযোগি আমার গ্রামে বসবাসকারী এমন দুইজন রাজাকার আমার অজান্তে একই প্রক্রিয়ায় এ ধরনের সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে। পুরো দেশেই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। কেবল আমিই নই, পুরোদেশবাসী এ ধরনের ঘটনার প্রত্যক্ষদশী । এসব ঘটনায় ক্ষুদ্ধ হয়ে আমার মতো অনেক সৎ ও দেশপ্রেমিক ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ও মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭২ সনেই আওয়ামী রাজনীতি হতে সরে দাঁড়ান। শেখ মুজিব সরকার দালাল আইন প্রণয়ন করে দালালদের বিচার কাজ শুরু করলে অপরাধীরা সংগৃহীত সার্টিফিকেট আদালতে পেশ করে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ কাগজে-কলমে হালকা হয়ে যায়।

দ্বিতীয়তঃ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করার পরিবেশ ও গ্রহণযোগ্যতা বিলীন করার জন্য ভারতের ভূমিকা আরো নিন্দনীয় । ভারত পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীদের ভারতে নিয়ে গিয়ে কেবল বিপুল পরিমাণ যুদ্ধাস্ত্রই (যেগুলো বাংলাদেশেরই প্রাপ্য) দখল করেনি, তাদের মুক্তির বিনিময়ে কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানের কাছ থেকে নানাবিধ সুবিধা আদায় করে শিমলা চুক্তি স্বাক্ষরে পাকিস্তানকে বাধ্য করে। অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করে তাদেরকে মুক্তি দেয়ার জন্য ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ’এর মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে ভারত বাংলাদেশকেও বাধ্য করে। ভারতের চাপে ৯৩ হাজার যুদ্ধাপরাধী, এমনকি সর্বশেষ ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার করাও সম্ভব হয় নি। মূল অপরাধীদের বিচার না করে তাদের সৃষ্ট সহযোগী জামায়াত মুসলিম ও লীগ নেতৃবৃন্দ, রাজাকার, আলবদর, আল শামস্’ বাহিনীর সদস্যদের বিচার অর্থহীন হয়ে পড়ায় শেখ মুজিব সরকার দালাল আইন প্রত্যাহার ও অপরাধীদের সাধারণ ক্ষমা প্রদান করেন। মূল অপরাধী পাকিস্তানী সৈন্য এবং তাদের বিনা বিচারে ছেড়ে দেয়ার দায়ে অপরাধী ভারতের বিচার না করে মূল অপরাধীদের ক’জন সহযোগিদের বিচার কতোখানি গ্রহণযোগ্য তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

তৃতীয়তঃ দেশবাসী জামায়াতের সাথে আওয়ামী লীগের হানিমুন তথা সখ্যতার কথা ভুলে যায় নি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র সহযোগী হিসেবে জামায়াতও যুগপৎ আন্দোলনে শরিক হয়। ১৯৯২ সনের নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করলে সংসদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর অনুকূলে জামায়াত’এর সমর্থন চেয়ে স্বয়ং শেখ হাসিনা গোলাম আযমের কাছে প্রতিনিধি পাঠিয়ে তার দোয়া কামনা করেন। এর পরের ঘটনা আরো চমকপদ । একদিকে বিএনপি সরকার ও জামায়াতের ওপর চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’এর ইন্ধনে ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র ব্যানারে তথাকথিত ‘গণআদালত’ গঠন করে গোলাম আযমের বিচারের দাবি তোলা হয়, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ জামায়াতে ইসলামীকে সাথে নিয়ে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনের সূচনা করে। এমনকি এ সময়ে গোলাম আযমের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ‘থিওরী’ গ্রহণ করে কিরে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে দেশ অচল করে দেয়। আজকের স্বরাষ্ট্র তখন সরকারী আমলা থাকা সত্বেও সব নিয়ম ভেঙ্গে তার একান্ত সহযোগিতায় ও অংশ গ্রহণের মাধ্যমে প্রেসক্লাবের মাধ্যমে ‘জনতার মঞ্চ’ তৈরি করা হয়। বিএনপি সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি মেনে নিতে বাধ্য হয় । এভাবে জামায়াতের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করে, গোলাম আজমের কাছে প্রতিনিধি ও দূত পাঠিয়ে এবং তাদের সমর্থন চেয়ে, সর্বোপরি গোলাম আযমের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার থিওরি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে আওয়ামী লীগ জামায়াতকে স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি এবং দেশপ্রেমিক দল হিসেবে মেনে নিয়েছে ।

অন্যদিকে তথ্যাভিজ্ঞমহলের বিশ্বাস, শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ও আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে জামায়াত বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ১৯৯৬ সনের সাধারণ নির্বাচনে জামায়াত ইসলামী ৩০০ আসনে নির্বাচন না করলে শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার সুযোগ পেতো না । ঐ নির্বাচনের প্রাক্কালে জামায়াত নেতা অধ্যাপক গোলাম আযম সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সগর্বে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, জামায়াত সরকার গঠনের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু ঐ নির্বাচনে জামায়াত ইসলামী মাত্র তিনটি আসনে বিজয়ী হয়। আসন সংখ্যা কম হলেও মোট অর্জিত ভোটের দিক থেকে জামায়াতের অবস্থান ছিল তৃতীয়। আওয়ামী লীগ ১৪৬ আসন পায়। এরশাদ ও জামায়াতের সমর্থন এবং জাসদ’এর একমাত্র সদস্য আ স ম আবদুর রবকে মন্ত্রী বানিয়ে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হবার গৌরব অর্জন করেন। ঐ নির্বাচনে বিএনপি ১১৬ আসন লাভ করে। জামায়াত ৩০০ আসনে প্রার্থী দেয়ায় জাতীয়তাবাদী শিবিরের ভোট দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। এরশাদের দলও এ শিবিরের বেশ কিছু ভোট টানে। ফলে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ বেশি আসন পায়। জামায়াত ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্ধীতা না করলে আওয়ামী লীগ প্রাপ্ত আসনের অর্ধেক পেত কী না, তা’ নিয়ে যথেষ্ঠ সন্দেহ রয়েছে। সে অবস্থায় আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনা সরকার গঠনের সুযোগ পেতেন না। তাদের মতে, ঐ সময়ের কথা যাদের মনে আছে, তারা স্বীকার করবেন যে, ঐ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬ আসনে বিজয়ী হয়ে বিভিন্ন দলের সমর্থনে সরকার গঠন করতে না পারলে শেখ হাসিনার রাজনীতি ঐ বছরই শেষ হয়ে যেতো এবং আওয়ামী লীগ কমপক্ষে দুই থেকে তিন টুকরা হতো। শেখ হাসিনার রাজনীতি এবং আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব এভাবে জামায়াতের সহযোগিতায় রক্ষা পায় । তথ্যাভিজ্ঞমহলের মতে, ৩০০ আসনে নির্বাচন করার জামায়াতের সিদ্ধান্ত কেবল ভ্রমাত্মকই ছিল না, এটা ছিল অমিষ্যকারী অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত। সে সিদ্ধান্তের খেসারত এখন জামায়াতকে কড়ায়-গণ্ডায় শোধ করতে হচ্ছে । অন্যদিকে দেশ অঘোষিতভাবে ভারতের প্রভাবাধীন হয়ে গেছে। ভারতীয় রাডার থেকে যে বাংলাদেশ’কে আর বের হতে দেয়া হবে না, তেমন ঘোষণা শেখ হাসিনা দ্বিতীয় দফা ক্ষমতায় আসার পরপরই ভারত দিয়ে রেখেছে।।

ঐ নির্বাচনের আগে জামায়াত-আওয়ামী লীগ আঁতাত তথা হানিমুনের কারণ ছিল জামায়াত ভেবেছিল এরশাদ, বিশেষত বিএনপি’র বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করে জামায়াত দেশপ্রেমিক দল হিসেবে সার্টিফিকেট পেয়ে গেছে। সে সার্টিফিকেটের কারণেই ১৯৯৬ সনে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা ’৭১ সনের পাকিস্তানপন্থীদের বিচার করার সামান্যতম উদ্যোগও নেন নি। কারণ তার পিতাই বিচার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এমনকি ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র সৃষ্ট তথাকথিত ‘গণআদালত’ গোলাম আযমকে ফাঁসি দেয়ার যে রায় দিয়েছিল, শেখ হাসিনা সরকার সে রায় কার্যকর করার সামান্যতম তৎপরতাও চালায় নি। শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদের এক পর্যায়ে জামায়াত আওয়ামী লীগের সাথে হানিমুনের ইতি ঘটিয়ে বিএনপি’র সাথে জোট বাঁধে এবং ২০০৫’এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়। আওয়ামী লীগ নিশ্চিত জামায়াত আর কখনোই আওয়ামী শিবিরে যাবে না। এটাই হলেও জামায়াত নির্মূলে চলমান আওয়ামী সুনামি’র মূল কারণ।

১৯৯৬ সনে জামায়াতকে দিয়ে ৩০০ আসনে নির্বাচন করিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার যে সুযোগ নিয়েছিল, এবার এরশাদকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনে জেতার সম্ভবনা নেই বলেই আওয়ামী লীগ জামায়াত-শিবির নিধনে নেমেছে। জামায়াত-শিবির নিধন সম্ভব হলে বিএনপি’কে জামায়াত তথা স্বাধীনতা বিরোধীদের সমর্থক হিসেবে শেষ করার পরিবেশও তৈরি করা যাবে। পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন, বাংলাদেশে ভারতপন্থী ছাড়া আর কারো থাকার অধিকার নেই, এমন একটি মহাপরিকল্পনাকে সামনে নিয়ে সরকার এগুচ্ছে।

রাজাকারদের বিচাররের নামে জামায়াত তথা জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নির্মূল করার উদ্যোগের পেছনে ভারতের সক্রিয় ইঙ্গিত রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। জামায়াত এবং জামায়াতের তথাকথিত সমর্থক হিসেবে দেশপ্রেমিক শক্তিকে ভারত যারপরনাই ভয় করে। ক’মাস আগে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ভারতীয় গোয়েন্দা জরিপের নিরিখে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশকে জামায়তপন্থী উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এখানেই ভারতের ভয়।
অন্যদেিক ভারত শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার জন্য মরিয়া । ভারতে ইতোমধ্যেই এমন ব্যাপক আলোচনা ও পরামর্শ সভা হয়েছে যে, শেখ হাসিনার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ভারত বাংলাদেশের স্বার্থ, এমনকি অস্তিত্ববিরোধী সুবিধা, আদায় করেছে সেগুলো ধরে রাখতে এবং আরো সুবিধা আদায় করতে হলে শেখ হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে হবে। তা’হলেই ভারতের পূর্ব ঘোষণা (অর্থাৎ বাংলাদেশকে আর কখনোই ভারতীয় রাডারের বাইরে যেতে দেয়া হবে না) বাস্তবায়িত করা এবং বাংলাদেশকে নামমাত্র ছায়ারাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব হবে। কিন্তু ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ তাদের চর তথা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশে একাধিক জরিপ চালিয়ে নিশ্চিত হয়েছে যে, জামায়াত-বিএনপি’র ঐক্য অটুট রেখে পরবর্তী নির্বাচন স্বাভাবিকভাবে হলেও আওয়ামী লীগ বিজয়ী হবার কোন সম্ভবনা নেই। এ পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেয়ার জন্যই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে দেশে অহেতুক নারকীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জামায়াতকে নির্মূল এবং বিএনপি’কে পঙ্গু করে যেনতেন নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখা সম্ভব হতে পারে।

জামায়াত তথা জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নির্মূল করার খেলায় ভারতের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে। একাত্তর সনে জামায়াতের ভূমিকা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয় হওয়া সত্বেও ’৭১ সনের পর থেকে জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার নির্ভরযোগ্য শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এর নেতৃত্ব ও কর্মীবাহিনী’র দু’চারটা দোষ-ত্র“টি শর্তেও অন্যসব দলের চেয়ে আদর্শিকভাবে এরা অনেক বিতর্কের উর্দ্ধে। বাংলাদেশের যে দলকে ভারত ভয় করে এবং প্রকৃত অর্থে মূল্যায়ন করে, তার নাম হলো জামায়াত । তাই জামায়াতকে নির্মূল করতে হবে।
বিএনপি ও জামায়াত ভারত ও আওয়ামী লীগের খেলা বুঝতে পেরেছে বলেই মনে হয় । তাই বিএনপি মনে করে বর্তমান বিচার কেবল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরই নয়, ভারতের আগ্রাসী পথের কাঁটা উপড়ে ফেলারও কৌশল বিশেষ। এ বিচার যে ভারতীয় নীল-নকশার অংশ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও তা বোঝে। এ কারণেও দেশে-বিদেশে এ বিচার স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়েছে। আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এ বিচার স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার যে পরামর্শ তথা দাবি উঠেছে, তার মানে হলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ বিচার মেনে নিচ্ছে না। দেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, জামায়াত আওয়ামী লীগ তথা ভারতের বিটিম হিসেবে থাকলে তথাকথিত মানবতাবিরোধী বিচারের নামে জামায়াতের ওপর এমন ঝড় বইয়ে দেয়া হতো না। ভারতের ইঙ্গিতে এবং সহযোগিতায় শেখ হাসিনা এমন কাজে হাত দিয়েছেন।

কোন কোন সংবাদ মাধ্যমে খবর এসেছে যে, এ বিচাররের নামে বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্য প্রেরণের মতো একটা চরম পরিস্থিতির দিকে দেশকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ১৯৭২ সন থেকেই ভারত তেমন সুযোগের জন্য অপেক্ষা করছে। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি জৈল সিং প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে, ১৯৭২ সনে বাংলাদেশ হতে ভারতীয় সৈন্য সরিয়ে সিদ্ধান্ত নাকি ভুল ছিল, এতে নাকি ভারতের জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এ কারণে ভারত বাংলাদেশে পুনরায় সৈন্য প্রেরণ করে এ দেশকে অধীনস্থ রাখার উদ্দেশ্যে চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। ২০০৯ সনে বিডিআর সদর দফতরে নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর প্রণব মুখার্জি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, বাংলাদেশ চাইলে ভারত সৈন্য প্রেরণ করতে প্রস্তুত। এর সাথেই তিনি যোগ করেছিলেন, শেখ হাসিনাকে বিব্রত করা হলে ভারত চুপচাপ বসে থাকবে না (অর্থাৎ ভারত সরাসরি বাংলাদেশ আক্রমণ করবে)। এমন খবরও ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে এসেছে যে, শেখ হাসিনাকে তুলে নেয়ার জন্য ভারতীয় বিমান বাহিনী প্রস্তুত। এমন আগ্রাসী প্রণব রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশে এসে দেশবাসীকে ‘গণতন্ত্র’ অব্যাহত রাখার নছিহত করেছেন। শেখ হাসিনাও এমন কথা বারবার বলেছেন। এর মানে হলো শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকা মানেই হলো গণতন্ত্র থাকা। যেসব নির্বাচনে শেখ হাসিনার দল পরাজিত হয়েছে, সেগুলো ছিল ‘সুক্ষ্ম কারচুপি’ ও ‘স্থুল কারচুপি’র শিকার। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার জন্য প্রণব সেদিন শেখ হাসিনাকে কি কি আশ্বাস দিয়ে গেছেন তাও কোন কোন সংবাদপত্রে এসেছে। অনেকেই মনে করেন ভারতের ইঙ্গিত ও সমর্থনে সরকার নিজদেশের জনগণের ওপর বেগম খালেদা জিয়ার ভাষায় ‘গণহত্যা’ চালিয়েছে। তাদের মতে, সরকার তার যুদ্ধাংদেহী অবস্থান থেকে মোটেই সরে আসবে না, বরং আরো মারমুখি হবে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের সাথে সম্পাদিত চুক্তিবলে ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশে প্রবেশ করলে পুরো দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে মারাত্মক দীর্ঘ মেয়াদী হানাহানির ক্ষেত্রে পরিণত হবে, যা বাংলাদেশ তো বটেই এমনকি ভারতের জন্যও বিপর্যয় বয়ে আনবে।

এ অবস্থার ইতি, তথা ভারতীয় হস্তক্ষেপ প্রতিহত করার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে উভয় পক্ষকে সংলাপে বসার তাকিদ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ঐ সংলাপ যাতে আদৌ হতে না পারে সেজন্যই আওয়ামী লীগ এমন অপমানজনক শর্ত জুড়ে দিয়েছে, যা মেনে নেয়া বিএনপি’র পক্ষে মোটেই সম্ভব নয় । বিএনপি বোঝে এমন শর্ত মেনে নিলে বিএনপি’র জন্য তা বুমেরাং হতে পারে। বিএনপি’র অধিকাংশ নেতা-কর্মী মনে করেন রাজাকারদের সাথে নিয়ে আন্দোলন করার সংস্কৃতি তো আওয়ামী লীগই শুরু করেছে। সুতরাং বিএনপি একই কাজ করলে আওয়ামী লীগের আপত্তি বিএনপি’র কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কেন । সংলাপের বিনিময়ে ‘জামায়াত’এর সঙ্গ ছাড়তে হবে, এমন পূর্বশর্তের উ্েদ্দশ্য ’৯৬ এর মতো আরেকটা নির্বাচন করা, যাতে আওয়ামী লীগই উপকৃত হবে । বিএনপি আওয়ামী লীগের এ চালাকি ধরে ফেলেছে। তাই বিএনপি আওয়ামীয় লীগের প্রস্তাব ইতোমধ্যেই প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে বিএনপি’র কাছ থেকে প্রত্যাশিত সমর্থন-সহযোগিতা না পাওয়া সত্বেও জামায়াতও আঠার দলীয় জোট ছাড়বে বলে মনে হয় না। এর ফলে সমঝোতার বা সংলাপের কোন সম্ভবনা নেই। তা’ছাড়া মরহুম আবদুল মান্নান ভূইয়া ও আবদুল জলিলের সংলাপের প্রহসন ও অভিজ্ঞতা মানুষের মন থেকে এখনো মুছে যায় নি।

এতদসত্বেও ক্ষমতার দ্বন্ধ যেন দেশঘাতি না হয়, তেমন দেশপ্রেমসূচক পন্থা ও আচরণ আমাদের মতো সাধারণ জনগণ রাজনীতিকদের কাছে প্রত্যাশা করেন। ঘর থাকলে সে ঘরে আমি থাকব কিংবা আমার প্রতিবেশি থাকবে । কিন্তু ঘর বিলীন হয়ে গেলে কেউই থাকার সুযোগ পাব না। ব্যক্তি, পারিবরিক ও দলীয় সংকীর্ণতার উর্দ্ধে উঠে সবাইকে দূরদর্শিতামূলক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ ধরনের সিদ্ধান্তু প্রধানতঃ ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকেই আসবে হবে। সব দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তায়। বিরোধী দলের ভূমিকা এখানে নগন্য। আওয়ামী লীগকে এ বস্তবতা অনুধাবন করতে হবে। আওয়ামী লীগের অপমানজনক পূর্বশর্ত দেশকে আরো অশান্তির দিকে ঠেলে দেয়ারই ইঙ্গিত । অনেকের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের সংলাপের প্রস্তাব আন্তরিকতাহীন ও অপমানজনক । এটা সংলাপ ও সমঝোতা ভাষা হতে পারে না। শান্তি ও দেশরক্ষায় সব পক্ষকেই আন্তরিক হওয়া ছাড়া অন্যকোন বিকল্প নেই। অন্যথায় দেশের অস্তিত্ব চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।*
লেখক: বাংলাদেশী-আমেকিান সাংবাদিক ও গবেষক
ইমেল: হড়ধ@ধমহর.পড়স

হুমায়ুন আহমেদ’এর মৃত্যু, দাদাদের আচরণ ও আমাদের শিক্ষা
মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন

আমাদের গর্ব হুমায়ুন আহমদের মৃত্যুর পর পশ্চিম বাংলা তথা ভারতীয়দের আচরণ দেখে আমার মনে বার বার প্রশ্ন জেগেছে হুমায়ুনের পরিবার তথা বাংলাদেশ কি ভারতের কোন মহলের কাছ থেকে সামান্য শোকবার্তাও আশা করতে পারেনা। ভারতের পশ্চিম বংগের মুখ্যমন্ত্রী, কারো কারো দিদিমনি মমতার অথবা আমাদের কথিত জামাতা, আবার কারো কারো কাকাবাবু/দাদাবাবু বা মুরুব্বী প্রণব মুখার্জিরা কি এতোই বধির হয়ে গেলেন যে তারা শোনেন নি, যে কিংবদন্তী হুমায়ুন আহমেদ আর নেই।
ধরে নিলাম মমতার কোন মমতা নেই। তা তিস্তার পানি বণ্টন বিতর্কেই বুঝেছি। মমতা মুখ্যমন্ত্রী হবার আগেই, সারা বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে এদেশের উপরের মহলের অতি উৎসাহীরা তাকে অভিনন্দিত করেছেন। তারা এখন কী ভাবছেন? তাদের এমন আগ বাড়িয়ে আনন্দ-আনুগত্যতা প্রকাশের রহস্য কোথায়?

আর প্রণব ভারতের অলঙ্কারিকপদে আসীন হবার পর এপাড়ের শালা-সমুন্দিরা যেভাবে উথলে উঠলেন দুলাভাইয়ের নিরবতা দেখে তারা এখন কি বলবেন? কেননা তার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার সম্ভবনা দেখা দেয়ার পর থেকে একদল তাকে নিয়ে নাচানাচি শুরু করে, যেন তারাই ভারতের রাষ্ট্রপতি হয়ে গেছে। অজুহাত দেখানো হয়েছে তিনি বাঙালী । কিন্তু এতে আমাদের গর্বিত হবার কী আছে? প্রণব যতো না বাঙালী, তার চেয়ে বেশী ভারতীয়। আমাদের আনন্দিত বা গর্বিত হবার রহস্যটা কোথায়? এ রহস্যটা বুঝতে পারছি নে। কেউ কেউ আবিষ্কার করে তার শ্বশুরবাড়ি বাংলাদেশে। তাতেই বা কি হলো? আরো কতো অজুহাত। কতো ধরনের বাহানায় প্রণবের এমন গুণকীর্তণ, যা তার প্রাপ্র্য নয়, পাওয়া উচিত নয়, তেমন খোশ আমদেদ জানালো এই গোষ্ঠীটি। দুর্মুখরা বলে বেড়ায় আসলে এদেরকে উদ্দেশ্যমূলকভাবেই মাঠে নামানো হয়েছে, এরা আসলে ভাড়াটে। কারণ ভারতীয় বাংলাভাষীরা ততোখানি উদ্বেলিত নয়, যতোখানি হয়েছে এসব ভাড়াটেরা। এদের আচরণ দেখে বাংলাদেশে প্রচলিত একটি প্রবচণ মনে পড়লো - মা কয় না পুত, খালা কয় বোনপুত।

কোন কোন বেয়াড়া লেখক এদেরকে পরজীবী মতিয়া-মেননের সাথে তুলনা করেছেন। এই দুই পরজীবী ও তাদের সারগেদদের এককালে মস্কো-পিকিং’এর মাসোহারা পাবার কাহিনী এদেশের পাড়ায় পাড়ায় বলা হতো। (কমিউনিজম ঝাটাপেটা খাওয়ার পর এরা ভারতীয় দাদাদের ধূতি আঁকড়ে ধরে। স্বাধীনতা যুদ্ধে সামান্যতম ভূমিকা না রেখে আজীবন শেখ মুজিবের বিরোধিতা করে এরা এখন শেখ হাসিনার কাঁধে শোয়ার হয়ে আমাদেরকে ছবক দেয়। অথচ এরা চট্টগ্রাম জেলে আমাকে একা পেয়ে ‘মার্কিনীদের লেলিয়ে দেয়া কুত্তা শেখ মুজিবের ছাও’ বলে গালমন্দ করতো। তবে মরহুম এম এ আজিজ একই জেলে একই কক্ষে আসার পর এ ধরনের আক্রমণ হতে আমি রক্ষা পাই। শেখ হাসিনা’র কাছে কিনারে এদেরকে দেখে আমার মতো স্বার্থহীন মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষোভে দুঃখে নিজের গায়ে নিজেরা কামড়ান)। বলা হতো ‘রুবেল-ইয়েন’এর বিনিময়ে মস্কো-পিকিং’এ বৃষ্টি হলে মতিয়া-মেনন’রা ঢাকায় ছাতা ধরে - তাদের মস্কো-পিকিং’এর প্রভুরা বৃষ্টিতে ভিজতে পারেন এ আশংকায়। প্রণব রাষ্ট্রপতি হবার পর কোন কোন পত্রিকায় কেউ কেউ মতিয়া-মেননদের কাহিনী তুলে এনে বলেছেন, এরা এখন দিল্লীর দাদা-কাকাদের ছাতাধরা পার্টি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

ভারত/কলিকাতার কেউ আসলে এরা হন্যে হয়ে পড়ে। তৃতীয় শ্রেণীর নট-নটী যাদের কোন অবস্থানই নেই ভারতে - তাদেরকে ঢাকায় আনা হয় কিংবদন্তী হিসেবে । আর আমরা ভিমরুলের/পঙ্গপালের মতো ছুটে যাই তাদের অর্ধ-উলঙ্গ নর্তন-কুর্দন দেখতে। এদের বেলায় আমরা এমন ব্যক্তিত্বহীন হয়ে পড়ি যে, বিশাল আর্মী স্টেডিয়ামে বসার জন্য চেয়ার না পেয়ে মন্ত্রী বসে পড়েন মাটিতে। এমন নিলর্জ্জতা দেখে মনে হয় এরা বলতে চাচ্ছেন, ‘কি যাদু করিলা পীরিতে মজাইলা, রহিতে পারিনা ঘরে তে ---’ ; তাই মাটিতে বসে পড়া। কেমন সম্মান আর উপঢোকনে ভূষিত করা হয় এদের ? ভারত বিশেষত পশ্চিম বাংলার লেখক, প্রকাশক, সংবাদপত্র ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মালিক এবং নট-নটীদের পয়সা আয়ের অন্যতম উৎস হলো বাংলাদেশ। আমাদেরকে ছাড়া ওরা অচল মাল। অথচ এরা আমাদের দেশের একটা চ্যানেলও দেখায় না কলিকাতা, আগরতলায়, গৌহাটিতে। প্রতিদিন হাজার হাজার হিন্দি-বাংলা গান ও ছবির সিডি বিক্রি হয় বাংলাদেশে, আমাদের একটাও যায় না ভারতে। সংগীতে নাটকে সাহিত্যে আমরা এখন অনেক অগ্রসর। তাদের ভয় আমাদেরগুলো ভারতে ঢুকতে দেয়া হলে তাদের যে সামান্য বাজার রয়েছে, তা বাংলাদেশের দখলে চলে যাবে। 

সুনীল ও সমরেশ ছাড়া আর তেমন কাউকে দেখা যায়নি হুমায়ুনকে নিয়ে কথা বলতে। এ দু’জন হয়তো বলেছেন হুমায়ুনকে ভালবেসে নয়, বাংলাদেশে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে। বাংলাদেশ ছাড়া ওদের পাঠক কোথাও নেই। সুনীল-সমরেশ’রা জীবিত হুমায়ুনকে কী একবারও সম্মান জানানোর আত্মিক তাড়না অনুভব করেছেন? সুনীলরা বাংলাদেশে কতোবার সফর করেছেন? আর হুমায়ুনকে কি তারা একবারও ডাকার উদ্যোগ নিয়েছেন? হুমায়ুনের বই পশ্চিম বাংলায় বিক্রির তাদের কোন উদ্যোগ ছিল কি? সুতরাং হুমায়ুনের পক্ষে এখন দু’কথা বলা আর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেয়া এক কথা।

সুনীলগংরা কতো শতবার বাংলাদেশে এসেছেন তার সর্বশেষ পরিসংখ্যান আমার হাতে নেই। তবে ১৯৯৮ সনের পড়েছিলাম তিনি ১০৯ বার বাংলাদেশ সফর করেছেন। এর উদ্দেশ্য দ্বিবিধ: বাংলাদেশ থেকে অর্থ চুষে নেয়া এবং এদেশে তাদের চর তৈরী করা। এ দুটো ক্ষেত্রে তারা সাফল্য অর্জন করেছেন। আমাদের অর্থ দিয়ে তারা আমাদের দেশে চর তৈরী করেন, নতুন মতিয়া-মেনন তৈরী করেন। আমাদের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, বুদ্ধিজীবী এবং আমলা অঙ্গন এখন ভারতের দখলে। তাই আমাদের কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীদের কোন মূল্যায়ন হয় না পরাধীন পশ্চিম বাংলায়। মূল্যায়ন হয় তসলিমার, দাউদ হায়দারদের, কারণ তারা আমাদের বিশ্বাস ও অস্তিত্ববিরোধী - সীমান্ত উপড়ে ফেলার বরকন্দাজ। মূল্যায়ন পেয়েছেন শামসুর রাহমান, কারণ তার কাছে আমাদের পবিত্র আজান ‘বেশ্যার চিৎকার’এর মতো। তাদের কাছে আবুল বারকাত-মুমতারসীগংরা বুদ্ধিজীবী তারা ভারতীয় লাইনে লেখেন। হুমায়ুন আহমেদরা তেমন নয় বলে তিনি বুদ্ধিজীবীর সনদও পান নি, কিন্তু তার অনুজ মোটা বুদ্ধিজীবী। এটাও যেন মুমতাসিরের প্যান্টাসি। আওয়ামীপন্থী-ভারতপন্থী না হলে যেমন স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি হওয়া যায় না, তেমনি আওয়ামীপন্থী-ভারতপন্থী না হলে বুদ্ধিজীবীও হওয়া যায় না। এটা একটা ডিজিটাল তেলেসমাতি। একারণেই সুনীল-সমরেশরা বাংলা সাহিত্যে হুমায়ুন আহমেদ’এর অবদানকে স্বীকৃতি দেন নি। হুমায়ুন আহমেদের বই পর্যন্ত কলিকাতা, আগরতলা, গৌহাটি’ বা অন্যত্র বিক্রির ব্যবস্থা হয় নি। ১৯৯৪ সনের দিকে কলিকাতার একটি প্রকাশনী সংস্থা হুমায়ুন আহমদের বই বাজারজাতকরণের চুক্তিতে আবদ্ধ হলে কলিকাতার অন্যসব প্রকাশক তথা পুস্তক ব্যবসায়ীরা জোটবদ্ধ হয়ে ঐ সংস্থার বিরুদ্ধে ধর্মঘট করে এবং ঐ চুক্তি বাতিল করতে তাকে বাধ্য করে। সুনীল-সমরেশরা এর বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেন নি।
হুমায়ুন আহমেদ’এর মৃত্যুর পরেও তার গ্রন্থগুলো ভারতে প্রকাশের কোন ব্যবস্থা করতে সুনীল-সমরেশরা সামান্য উদ্যোগও নিতেন, তাহলেও বুঝতে পারতাম যে, মৃত হুমায়ুনকে তার স্বীকর ও সম্মান করেন। সুনীল মারা যাবার পরে তাকে নিয়ে ভারতীয় পোষাজীবীরা যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তা যতো না সুনীলের জন্য, থার চেয়ে বেশি ভারতের নেক-নজরে থাকার জন্য। এটা তাদের দায়িত্ব, অনেকটা চাকরির মতো।

এরা মৃত হুমায়ুন আহমেদকেও ভয় করে। তাদের ভাষায় পূর্ব বাংলার ‘চাষাভূষার’ পোলারা জনপ্রিয়তা এবং সৃষ্টিতে এখন তাদেরকে ছাড়িয়ে গেছে। এটা তারা সহ্য করতে পারতো না। তাই স্বীকৃতিও দিতে চায় নি। ভারতীয় পোষাজীবীরা যেন-তেন কবিতা লিখে, গানগেয়ে, নাটক লিখে ভারতের অহরহ দাওয়াত পায়, স্কুলের পোলাপানকে বোনাই প্রণব দিল্লীর দরবারে নিয়ে যায় কেনা’র প্রক্রিয়ার প্রজেক্টে ঢোকানোর জন্য, কিন্তু হুমায়ুন আহমেদকে বোনাইবাবু মনে হয় চিনতেনই না। কারণ হুমায়ুন পোষাজীবী হতে রাজি ছিলেন না। সে কারণে কথিত বাংলা প্রেমিক দাদারা হুমায়ুন আহমেদকে একবারও কলিকাতা, আগরতলা, গৌহাটিতে নেয়ার সৌজন্যতা বা উদারতা দেখাতে সক্ষম হয়নি। ভারত সরকার রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেও তাকে ভারতে নেয়ার চেষ্টা করেনি। এমনকি ভারতের কোন টিভি চ্যানেলে তার কোন সাক্ষাৎকার নিয়েছে এমন খবর আমি শুনি নি। অথচ আমাদের চ্যানেলগুলো সেখানকার থার্ড গ্রেডের মালদেরকে টিভি পর্দায় এনে কতো ধরনের প্রশংসায় মেতে ওঠে পোষাজীবীরা। 

ভারতীয় মুরুব্বীদের এদেশীয় ভাড়াটেদের কেউ কেউ আমাদের সামনে আসলে বলেন, আসলে দাদারা ‘অনুদার’, ‘কিপ্টা’। যদি তা-ই হয়, তবে তাদের ব্যাপারে আমরা এতো দাতা হাতেমতাঈ কেন হবো? এই সেদিন রাজেস খান্নার মৃত্যু হলে বাংলাদেশের মিডিয়া কতো না কান্নাকাটি করেছে। রাজেস খান্না অবাঙালী। আমাদের সংস্কৃতি-সাহিত্য-চলচ্চিত্রের সাথে তার কোন সংযোজ নেই। তারপরেও তাকে নিয়ে কতো না কাহিনী শুনতে হলো বাংলাদেশের মানুষকে। যেন আমাদের দেশের কোন খ্যাতিমান চিত্রনায়ককে আমরা হারিয়েছে। কারণ আমাদের অধিকাংশ চ্যানেল মালিকরাও পোষাজীবীদের মতো ভারতীয় মালপানি খেয়ে থাকেন। তাই কোন কোন চ্যানেলে তার জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা হয়। তাদের যুক্তি: এটাই হলো একজন গুণী ব্যক্তিকে সম্মান জানানোর রীতি । গুণী ব্যক্তিদের সবাই কিী ভারতীয়? আমাদের দেশে কি গুণী ব্যক্তি নেই। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি ভ্যানেজুয়েরা প্রেসিডেন্ট হুজে মারা যাবার পর তার বিষয়ে সাধারণ খবর ছাড়া কোন চ্যানেলে কোন আলোচনা হয়েছে বলে জানি না। হোজের তুলনায় রাজেস খান্না কোন ছার? কিন্তু রাজেশের ভাগ্য তিনি ভারতীয় । আর ভারতীয় মানেই তিনি ও তারা পোষাজীবীদের কাছে প্রভুতুল্য।

অথচ ভারতীয়রা আমাদের ব্যাপারে সে রীতি অনুসরণ করে না। তাই তাদেরকে সর্বক্ষেত্রে বর্জন করতে হবে। ভারতীয় নট-নটীদের আমদানী বন্ধ করতে হবে। তাদেরকে কেউ এদেশে আমদানী করার উদ্যোগ নিলে তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলুন। তাদের বই, ছবি ও গানের সিডি, টিভি চ্যানেল বর্জনের আন্দোলন নিজ পরিবার থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দিন। তাদের বই, ছবি, গান না হলে কি আমাদের চলে না? আমরা কি তাদের বাজার বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে পারি না? 

তখন হয়তো বলা হবে আমরা সাম্প্রদায়িক? স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি। রাজাকার। যতো ইচ্ছে বলা হোক, তাতে আপত্তি নেই। আমাদের সব হারিয়ে অসাম্প্রদায়িক উদার বা স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি হবার গরজ বোধ করি না। ভারতকে সবকিছু দিয়ে দেয়াই যদি স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি হওয়ার মাপকাঠি হয়, তবে আমরা তা কখনোই হতে চাইবো না। আমরা স্বাধীনতার তেমন স্বপক্ষের শক্তি হতে চাই, আমরা যতোখানি দাদাদেরকে দেবো, ততোখানি দাদাদের কাছ থেকে নেব। এমনটি বললে আমাদের বিরুদ্ধে পোষাজীবীরা তেড়ে আসবে স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি নাম নিয়ে। এখন ভাবছি, কবে এরা বলে বসে দাদা-দিদি-কাকাবাবু তথা ভারতীয়দের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে কিছু বললে, লিখলে তা’ও হবে দেশদ্রোহীতার সামিল। তারপরেও বলব - প্রণব, মমতা, সুনীল, সমরেশরা এবং আমরা এক নই। ওরাই বার বার প্রমাণ করছে তারা ও আমরা ভিন্ন - মননে, চিন্তা-চেতনায়, স্বার্থে-স্বাধীনতায়। দুটো ভিন্ন স্রোতধারা, যা কোন দিন একই মোহনায় মিলিত হবার নয়। তারাই আমাদেরকে বিভক্তির দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

বাংলাদেশী পাঠক ও প্রকাশক এবং দর্শকদের অনুরোধ করবো আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। এত তরফা উদারতা বা বদান্যতা, বন্ধুত্ব ভ্রাতৃত্ব দুর্বলতার পরিচায়ক। এ দুর্বলতা হতে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। দাদাদের বর্জন করার সময় এসেছে। আমাদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও জাত্যাভিমানের যে দুর্ভিক্ষ লেগেছে, তা কাটিয়ে উঠতে হবে। আমাদের একটি অংশ নিজের খেয়ে পরের গীত গাওয়ার যে সংস্কৃতি চালু করেছে, তার ইতি টানতে হবে। আমাদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে, আমাদের অর্থে বিলাসী জীবন যাপন করে ক্ষমতায় থাকার জন্য কিংবা আসার জন্য আমরা কেন দাদাদেরকে আসল শক্তি বলে বিবেচনা করবো? আসুন আমরা সর্বক্ষেত্রে তাদেরকে বর্জন করি। হুমায়ুন আহমেদ হোন আমাদের তেমন চেতনার প্রেরণা। 


লেখক: আমেরিকা প্রবাসী সাংবাদিক ও গবেষক
ঊসধরষ: হড়ধ@ধমহর.পড়স

E Mail :  This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it

Comments (0)Add Comment

Write comment
smaller | bigger

busy

Highlights Archive

More Highlights

Science and Technology

Entertainment

Travel

Life Style & Fashion

Health