TueSep262017

কারাগারের অনিয়ম,দূর্নীতি আর অব্যবস্থাপনা প্রতিরোধে জেলকোডের আশু সংস্কার প্রয়োজন

  • PDF
Change font size:

 

 

অ্যাডভোকেট শাহানূর ইসলাম সৈকত, Bangladesh 

 বর্তমানে সমগ্র বাংলাদেশে অবস্থিত কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারগুলো উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক আইন অনুযায়ী প্রণীত জেল কোডের তালিকাভুক্ত বিধি ও আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে থাকে। এসব বিধি ও আইনের মধ্যে রয়েছে কারা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত কারা আইন ১৮৯৪;১৮৭১ এর কারাবন্দী আইন,কারাবন্দীদের ব্যবস্থাপনা ও প্রশিক্ষণ সম্পর্কিত ১৯০০ এর কারাবন্দী আইন,কারাবন্দীদের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত দেওয়ানী কার্যবিধি এবং বাংলাদেশ দন্ডবিধির ১৮৬০ এর আইন।

 সময়ের সাথে সাথে জেলকোড পরিবর্তন ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা গেলেও স্বাধীনতা পরবর্তী ৩৭ বছরেও ইহার প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বা সংস্কার করা হয়নি। যেটুকু হয়েছে তা সময়ের প্রয়োজন মেটাতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও সংস্কারের জন্য বিভিন্ন সময়ে গঠিত বিভিন্ন কমিটি কর্তৃক প্রণীত সুপারিশমালা আলোর মুখ দেখেনি এবং সেগুলো বাস্তবায়িত হয়নি।

 ইন্সপেক্টর জেনারেল অব প্রিজন (আইজি-প্রিজন) সমগ্র বাংলাদেশে অবস্থিত সকল জেলখানাগুলোর তত্ত্বাবধান করেন। তাকে অতিরিক্ত ইন্সপেক্টর জেনারেল অব প্রিজন (এআইজি-প্রিজন),ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল অব প্রিজন (ডিআইজি-প্রিজন),জেল সুপারিন্টেন্ডেন্ট,জেলার,ডাক্তার,ডেপুটি জেলার তত্বাবধানে সহায়তা করেন।

 বর্তমানে প্রচলিত জেলকোড অনুযায়ী সকল দন্ডিত কয়েদী,বিচার চলমান কয়েদী এবং সকল ডিটেনীর জন্য জেলখানায় ৩৬ বর্গফুট জায়গা বরাদ্ধ প্রদানের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে একজন বন্দীকে জেল কোডে বর্ণিত জায়গার এক তৃতীয়াংশ জায়গায় থাকতে হচ্ছে। অর্থাৎ-জেলখানাগুলোতে ধারণ ক্ষমতার তিনগুন বন্দী অবস্থান করছে ।

 প্রচলিত জেল কোডের ৩১ ধারা অনুযায়ী ইন্সপেক্টর জেনারেল অব প্রিজন (আইজি-প্রিজন) প্রতিবছর কমপক্ষে একবার কেন্দ্রীয় জেলখানা এবং অন্ততপক্ষে প্রতি দুই বছরে একবার জেলা জেলখানাগুলো পরিদর্শন করবেন।

 একইভাবে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে একবার জেলা জেলখানা পরিদর্শন করবেন । যদি কোন কারণে তিনি তা করতে অপরাগ হন তাহলে তার পরিবর্তে তার  অধস্তন  কোন সিনিয়র কর্মকর্তা বা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট জেলখানা পরিদর্শন করবেন ।

 এছাড়া ৫৫ ধারা অনুযায়ী সরকার জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক,বিভাগীয় কমিশনার,জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট,জেলা জজ,সিভিল সার্জন এবং জেলা স্কুল পরিদর্শক মহোদয়ের সমন্বয়ে জেলখানা পরিদর্শক দল গঠন করবেন যারা  নিয়মিত জেলখানা পরিদর্শন করবেন । ৫৬ ধারায় সংসদ ও বিভাগীয় কমিশনার কর্তৃক বেসরকারী জেল পরিদর্শক নিয়োগ দানের কথা বলা হয়েছে ।

 প্রচলিত জেল কোডে সরকারী ও বেসরকারী ভাবে জেলখানা পরিদর্শনের থাকলেও প্রকৃতপক্ষে ইন্সপেক্টর জেনারেল অব প্রিজন (আইজি-প্রিজন) কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের জেলখানা পরিদর্শনের যথেষ্ঠ সময় পায় না এবং তিনি খুব কম সময়ই জেলখানা পরিদর্শন করে থাকেন ।

 অনুরূপভাবে,অতিরিক্ত ইন্সপেক্টর জেনারেল অব প্রিজন (এআইজি-প্রিজন) এবং ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল অব প্রিজন (ডিআইজি-প্রিজন) কম সময়ই জেলখানা পরিদর্শন করে থাকেন । যদি কদাচিৎ করেনও তা পরিদর্শন পরবর্তী সময়ে বন্দীদের উপর নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি করা ছাড়া কোন মঙ্গল বয়ে আনেনা ।

 কারণ জেলখানা পরিদর্শনের পূর্বে সরকারী কর্মকর্তাগণ পরিদর্শন সংক্রান্ত খবর কারা কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। ফলে কারা কর্তৃপক্ষ পরিদর্শনকারীদের দেখানোর মত করে জেলখানা প্রস্তুতের যথেষ্ঠ সময় পায় এবং তারা  সেভাবে প্রস্তুত করেন । এসময়  কর্তৃপক্ষ কারা-অভ্যন্তরস্থ অব্যবস্থাপনা,দূর্নীতি ও অন্যান্য অবিচার সম্পর্কে পরিদর্শকদের না বলার জন্য বন্দীদের ভয়ভীতি  দেখানো হয়।

 তাছাড়া পরিদর্শকগণ সর্বদা কারা কর্তৃপক্ষকে সংগে নিয়ে করা-অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন এবং তা পরিদর্শন করেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বন্দীরা কারা-অভ্যন্তরস্থ অব্যবস্থাপনা,দূর্নীতি ও অন্যান্য অবিচার সংক্রান্ত বিষয়গুলো পরিদর্শকদের নিকট বলতে পারেন না । যদি কোন বন্দী তা বলেন তবে তাকে নির্মম নির্যাতন এমনকি মৃত্যু বরণ করতে হয় ।

 তাছাড়া, বেসরকারী জেল পরিদর্শক গণ সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ও নিয়োগ প্রাপ্ত হয়। রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদেরও পরিবর্তন করা হয়। যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে তখন সরকার সে দলের আদর্শে বিশ্বাসীদের জেল পরিদর্শক নিয়োগ করেন। ফলে ইহা বন্দীদের জন্য কোন মঙ্গল বয়ে আনে না।

 তাই,কারাগার সংস্কার সংক্রান্ত  আন্তর্জাতিক চুক্তি নির্যাতনের বিরুদ্ধে  কনভেনশনের ঐচ্ছিক প্রোটোকল অনুমোদন করে সে অনুযায়ী আমাদের দেশে প্রচলিত কারাগার সংক্রান্ত আইনসমূহের সংকলন জেল কোড সংশোধন করে কার্যকরভাবে জেলখানা পরিদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই কারাগারগুলোতে বিদ্যমান দূর্নীতি,অনিয়মের অবসান হয়ে কারা ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন হবে এবং কারাবন্দীদের মানবাধিকার সুরক্ষিত হবে।

 লেখক:মানবাধিকারকর্মী,আইনজীবী কলামিস্ট; প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব,জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ;ইমেল: This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it , ব্লগ: www.shahanur.blogspot.com

 

  

Comments (0)Add Comment

Write comment
smaller | bigger

busy

Highlights Archive

More Highlights

Science and Technology

Entertainment

Travel

Life Style & Fashion

Health