FriJul282017

ওরা কি বীরাঙ্গনার মর্যাদা পাবে?

  • PDF
Change font size:

 

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন


১৯৭১ সাল জাতির ইতিহাসে এক ভয়াবহ ও আতঙ্কের নাম। ২৫ মার্চ কালো রাত্রির অপ্রত্যাশিত আক্রমনের ফলে সব হিসাব নতুন করে করতে হয়েছে এদেশের নির্যাতিত জনগনকে, কিংকর্তব্যবিমূঢ় মানুষ সময় নষ্ট করেনি এক মূহুর্ত প্রতিবোধ গড়তে। আক্রমনের জবাবে প্রতিহত, প্রতিরোধ ও পাল্টা আক্রমণ করে তোলে হানাদার বাহীনির বিরুদ্ধে। শুরু হয় স্বাধীনতার পথে চলা। কিন্তু যুদ্ধ মানেই নিরীহ মানুষের উপর আক্রমন ও খড়গ নেমে আশে নানা অজানা আক্রমনের মাধ্যমে। বিশেষ করে নারী -শিশু ও বৃদ্ধের অবস্থা অবর্ণনীয়। শিশু ও বৃদ্ধ আত্মরকার উপায় খুঁজে পায় না কোন ভাবেই । আর নারীরা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত কারণ সবার আক্রমনের শিকার তারা। শত্রু পক্ষই কেবল নয়, স্থানীয় হিংস্র নরাধমরাও লোলুপ দৃষ্টি দিয়ে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কূপ্রবৃত্তিকে চরির্তাথ করার জন্য। কেবল যুদ্ধের সময় নয়, যদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ে ও পরাধীনতার মধ্যেও নারীরা অরক্ষিত থাকে। তাই স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে বিবেকবান মানুষ। জীবন বাজি রেখে ঝাপিয়ে পড়ে শত্রুর বিপক্ষে এবং মুক্ত বিহঙ্গে ডানা মেলে অধীকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়, কিন্তু স্বাধীনতার জন্য নিজের সম্মান বর্জন দিয়েও যদি স্বাধীন দেশে নিজেকে রক্ষা করতে না পারে তবে এমন স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও এদেশিয় দোসর এবং লস্পট পুরুষরা তাদের মনোরঞ্জনে তিন লক্ষ মা-বোনের ইজ্জ্বতকে নিয়ে খেলা করেছিল। হতাহত করেছে অনেকে । কিন্তু এই আক্রান্তদেরকে স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছর পরও সম্মান প্রদর্শন করতে পারিনি, এমন কি আমরা ব্যর্থ হয়েছি তাদের আপন করে নিতে। তাদের কাগজে কলমে বীরাঙ্গনা বলা হয়। কিন্তু কোন নির্যাতনের শীকার হলে তাদের বীরাঙ্গনা ডাকব কেন? আর যদি বীরাঙ্গনা বলি তবে সামাজিক মর্যাদা তারা আজও কেন পেল না? কেন আজও তাদের বলা হয় পমাণ করতে তারা বীরাঙ্গানা ছিল, তবেই তারা রাষ্ট্রীয় মর্যদা পাবে? এ কেমন প্রহসন? কী নির্মমতা করছি তাদের ভাগ্য নিয়ে? তাদের ইজ্জততের উপর দাঁড়িয়ে আমরা কথা বলছি, তাদের আমরা আবার প্রমাণ করতে বলছি তার বীরাঙ্গনা প্রমাণ করতে? প্রমাণের উপায় কী? স্বাধীনতার পর থেকে এ বিয়ল্লিশ বছরে আর কত নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, নিপীড়নের মাত্রা কত তীব্র হয়েছে তা কী করো হিসাবে আছে? এরা কাদের কারণে এমন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে বার বার? কেন আজ ও এর প্রতিকারের উদ্যোগ ও ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। আর জবাব দিবে কারা? তাছাড়া আরেকটি বিষয় অবশ্যই মাথায় আনা প্রয়োজন, তা হচ্ছে যারাই নির্যাতিত হচ্ছে শারীরিক বা মানষিক ভাবে তাদের সবাই কী বীরাঙ্গনা ? যদি তাদের নির্যাতনের কারণ আমাদের না জানায় তবে কেন জানাচ্ছে না? তবে কী ধরে নিব রাষ্ট্র ও সমাজ নির্যাতনের পক্ষে কথা বলছে না বলেই কি এমন ঘটনা বার বার ঘটছে? যদি তাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় তবে সে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা কী?

দিনের পর দিন কী হারে নারী নির্যাতন বাড়ছে এবং তার প্রতিকার বা প্রতিরোধে কোন ব্যাবস্থা আজ ও আমরা নিতে পারিনি। এর পিছনের মূল কারণ অর্থনৈতিক ও অর্থহীন জীবন যাপন এবং রাষ্ট্রীয় ভাবে ধর্মের গূরত্ব কমিয়ে দিয়ে অবাধ সংস্কৃতি নামে যে উত্তেজনা অনুষ্টান যুবকদের মাঝে ছড়িয়ে যাচ্ছে তা অন্যতম কারণ। এমন কি অধুনিকতার নামে প্রাশ্চাত্য সংস্কৃতির ও জীবন ধারায় নিজেকেও ভাসিয়ে দেয়াও আরেকটি কারণ। তবে এদেশের কলুষিত রাজনীতি কোন অংশেই কম দায়ী নয়, কারণ রাজনৈতিক নেতারা যেমন নিজেদের দাম্ভিকতা প্রকাশের জন্য নিজের অধিপত্য বিস্তারের জন্য কিছু যুবককে উশৃঙ্খল জীবনে উদ্ভুদ্ধ করে থাকেন। তাদের এমন প্রশ্রয়ে পুরো দেশে নেমে আসে নারীদের উপর নির্যাতন ও নিপীড়ন এবং পার পেয়ে যায় কুকর্মের সব নায়করা বরং কেন কোন ক্ষেত্রে আভিযোগ কারীরা আরো চরম পরিনতির শিকার হচ্ছে। এই পাপের ভার কী তাহলে সৃষ্টি কর্তাকেই দিব? কারণ তিনি পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের সৃষ্টি করেছেন।

গত ডিসেম্বরে ভারতে একটি গণপরিবহনে এক চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্রীকে গণধর্ষনের ফলে যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে এবং যে ভাবে প্রতিরোধের ঝড় উঠেছে নারী পুরুষ ও দল মত ধর্ম নির্বিশেষে যা অতুলনীয়। এমন সচেতনতার মাধমেই সম্ভব হচ্ছে দু®কৃতীকারীদের প্রতিরোধ করতে। কিন্তু আমাদের দেশে এমন হাজার ঘটনার পরও আমাদের মাঝে কোন প্রকার সমন্বিত উদ্যোগ দেখা যায় নি, যেখানে নারী পুরুষ ধর্ম বর্ণ রাজনীতির উর্দ্ধে উঠে আমরা সুন্দর একটি সহ অবস্থান মূলক রাষ্ট্র গড়তে পারবো। কেন পারিনি আজো? আমাদের বিবেক কি লোপ বা নি:শেষ হয়ে গেছে পুরোপুরি? আমরা কি মানুষ না পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট কোন প্রাণী? কেন আমার মা বা বোনের মত ভাবতে পারিনা? কোথায় আমাদের বিবেক হারিয়ে গেল?

গত কয়েটি দিনের দেশের আলোচিত কয়েকটি ঘটনা প্রবাহের দিকে নজর দিয়ে নারীর অবস্থান পরিস্কার হওয়া সম্ভব। গত ৬ জানুয়ারী কক্রবাজারের প্রিতাসাললী ইউনিয়নের রাবেয়া বসরী গণ ধর্ষনের শিকার হয়। ধর্ষকরা তাকে ধর্ষনের পর হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে রাখে। পারিবারিক বিভেদের জের এই ধর্ষন ও হত্যা । কিন্তু কেন পারিবারিক জেরের কারণে কোন পুরুষ যৌন নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয় না। এ কি কেবলই বিরোধের প্রতিশোধ না মানবতার অপমান?

ঠিক তার আগের দিন নঁওগার মহাদেব পুরে রেহেনা পারভিনকে তার স্বামী কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে। এমন হাজার ঘটনা যা আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়। মনের মধ্যে কোন রেখা পাত করেনা কারণ মানবিকতা হারিয়ে গেছে আমাদের মাঝ হতে। আবার আমরা যখন দেখি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী চাঁদনীকে শাহআলী থানার ঝিলপাড়ায দুবৃত্তরা গণধর্ষণ করে হত্যা করে ফেলে যায়। অথবা নরসিংদীতে মসজিদের ঈমাম, টাঙ্গাইলে বান্ধবীর কৌশলে দুবৃত্তদের হাতে কাউকে তুলে দিয়ে গনধর্ষণের ব্যবস্থা করে দেয় তখনো আমাদের বিবেক সাড়া দেয়নি।

আজ যখন দুবৃত্তরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বলে জাহাঙ্গীর নগরে একজনেই একশ ছাত্রীকে ধর্ষণ, বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণ করে এবং জোর করে তুলে নিয়ে বিয়ে করে বা বিয়েতে রাজী না হলে এসিড মারে অথবা কোন সংঘবদ্ধ দল জিয়ার মহিমা উচ্চারণ করে নারীর সম্ভ্রমহানি করে তখন রাজনৈতিক নেতারা তাদের রক্ষায় সবাত্বক এগিয়ে আসে। তার চেয়ে ও মজার বিষয় পাঠশালার মত বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যখন ছাত্রীদের ধর্ষন করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোন শিক্ষক ছাত্রীকে ভোগ করে প্রথম স্থান পাইয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নারীর সর্বষ্য কেড়ে নেয় তখন সে দেশে স্বাধীনতার মর্যাদা কি অম্লান হয়ে যায় না? ঐ সব ধর্ষিত নারীকে কি রাষ্ট্র রীরাঙ্গনার মর্যাদা দিবে?

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
সেক্রেটারি, চারুতা ফােউন্ডেশন
ও প্রভাষক, নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ

E Mail :  This e-mail address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it

Comments (0)Add Comment

Write comment
smaller | bigger

busy

Editorial / Commentry Archive

More Editorial / Commentry

Science and Technology

Entertainment

Travel

Life Style & Fashion

Health